শুক্রবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

অস্ত্রের ভূয়া লাইসেন্স গ্রহণ কারী ৬০ জনের জামিন নামঞ্জুর

অস্ত্রের ভূয়া লাইসেন্স গ্রহণ কারী ৬০ জনের জামিন নামঞ্জুর

স্টাফ রিপোর্টার:
রংপুর ডিসি অফিসের জিএম শাখা থেকে জেলা প্রশাসকের সই জাল, ভূয়া পুলিশ ভেরিফিকেশন দিয়ে ব্যাকডেটে ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে চারশ অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের নজিরবিহীন ঘটনায় চার্জশিটভূক্ত ৬০ ভূয়া অস্ত্রের লাইসেন্সগ্রহনকারীর জামিন প্রার্থনা না মঞ্জুর করেছে আদালত। গতকাল বৃহস্পতিবার রংপুর সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পন করে জামিন প্রার্থনা করেছিলেন তারা।

রংপুর আদালতের সিএসআই রেজাউল করিম রেজা জানান, স্বস্ব আইনজীবির মাধ্যমে দুপুরে চাঞ্চল্যকর এই অস্ত্র মামলায় রংপুর সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিন প্রার্থনা করেন দেশের বিভিন্ন এলাকার ৬০ ব্যক্তি। যারা অর্থের বিনিময়ে ওই ভূয়া অস্ত্রের লাইসেন্স নিয়েছিলেন। বিকেল চারটায় আদালতের বিচারক রাশেদা সুলতানা শুনানী শেষে তাদের জামিন আবেদন না মঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। তারা হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তিকালীন জামিনে ছিলেন। জামিন না মঞ্জুর হওয়াদের সবাই সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সামরিক আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ বিভিন্ন পদের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ছিলেন।

জামিন না মঞ্জুর হওয়া ৬০ ব্যক্তি হলেন নেত্রোকোনার আটপাড়ার লুনেশ্বরের মৃত গিয়াস উদ্দিনের পুত্র আনোয়ারুল হক, সিরাজগঞ্জের বেলকুচির বয়রাবাড়ির মৃত খলিলুর রহমানের পুত্র আমিরুল ইসলাম আম্বিয়া,  নেত্রোকোনা সদরের মালনীর মৃত নরেশ চন্দ্র শীলের পুত্র পিন্টু চন্দ্র শীল,  নোয়াখালির বেগমগঞ্জের তুসির মৃত তোফায়েল আহমেদের পুত্র মহিউদ্দিন, বগুড়ার ধুনটের বাণিয়াগাতির মৃত বেলায়েত হোসেনের পুত্র আবুল কালাম আজাদ, ব্রাক্ষণবাড়িয়ার আখাউড়ার দুর্গাপুর পুর্বপাড়ার খুরশিদ মিয়ার পুত্র আলম মিয়া, কুস্টিয়ার দৌলতপুরের কৈপালের মৃত আলী এলাহীর আয়াত উল্লাহ, বগুড়ায় সারিয়াকান্তির নিজ বলাইলের আব্দুল মোত্তালিব ছানার পুত্র একেএম আইনুর রহমান, রাজশাহীর চারঘাটের ফুফতেহপুরের মৃত মহসিন আলীর পুত্র মোবারক আলী খন্দকার, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার রসুলপুরের মৃত হজরত আলী শিকদারের পুত্র শাহিন শিকদার, বাগেরহাটের মোরলগঞ্জের গোয়ালবাড়িয়ার নুরুল ইসলাম তালকুদারের পুত্র আব্দুল বাশার শিকদার, নোয়াখালিল বেগমগঞ্জের কুতুবপুরের জয়নাল আবেদীন চৌধুরীর পুত্র ওমর ফারুক চৌধুরী, টাঙ্গাইলের নাগরপুরের কলাদিয়ার মৃত হেকমত আলীর পুত্র শহিদুল ইসলাম, মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের ইরতার মৃত রজব আলীর পুত্র আব্দুর রশিদ মিয়া, বগুড়ার শিবগঞ্জের ময়দান হাট্রার বুলু কান্দুর পুত্র শহিদুল ইসলাম কান্দুম দিনাজপুরের কোতয়ালীর দক্ষিণ বালুয়াডাঙ্গারর মৃত জালাল উদ্দিনের পুত্র মামুনুর রশিদ, সিলেটের গোপালগঞ্জের ঘোঘারপুর পশ্চিমপাড়ার মৃত ফজুল হকের পুত্র সালেহ আহম্মেদ, টাঙ্গাইলের ভয়াপুরের ফলা চন্ডিপুরের শুকুর আলীর পুত্র হাবিবুর রহমান, কুমিল্লার সদর দক্ষিণ মডেরেলের হোসেনপুর ওরফে সাতবাড়িয়ার মৃত আমীর আলীর পুত্র জাহাঙ্গীর হোসেন, বাগেরহাটের চিতলমারীর দলূয়াগুনির  মৃত হাদি খানের পুত্র আজিম উদ্দিন, যশোরের বাঘারপাড়ার ছাইবাড়িয়ার কাওছার আলীর মোল্লার পুত্র লে: (অব) কাছেদ আলী, দিনাজপুরের ফুলবাড়ির শ্রীরামপুরের মৃত আব্দুল খালেকের পুত্র জুয়েল রহমান, ব্রাক্ষনবাড়িয়ার নবিনগরের মৃত আব্দুল খালেকের পুত্র আবু জাহান, খুলনার দৌলতপুরের রাসেল কুঠির ক্রসরোডের মৃত কোরবান আলীর পুত্র জাহাঙ্গীর আলম, হবিগঞ্জের মাধবপুরের দেবপুরের মৃত নবী হোসেনের পুত্র কামরুল ইসলাম, টাঙ্গাইলের মধুপুরের বোয়ালীল মৃত আব্দল ফকির পুত্র আবু সাইম, গাজিপুরের শ্রীপুরের বেড়াবাড়ির সেহাজ উদ্দিনের পুত্র মেজবা উদ্দিন আহমেদ, বগুড়ার শাহজাহানপুরের নগর রামপুরের আবুল হোসেনের পুত্র আব্দুল কাফী, বগুড়ার ধনুটের ধামাচাপার মৃত তাবিবর রহমানের পুত্র সাইদুর রহমান, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের দশমিকার সরাফউদ্দিন তালকুদারের পুত্র আব্দুল মোমিন, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার ভেংড়ীর আজম আলী শেখের পুত্র বেলাল হোসেন, বগুড়ার গাবতলির পুঠিয়ার ঘোনের এরশাদ আলীর পুত্র সহিদুল ইসলাম, বগুড়ার গাবতলির রামুনিয়ার চাঁন মিয়ার পুত্র  শাহাজাহান আলী, রংপুরের পীরগাছার কামদেবের আব্দুস সামাদের পুত্র মাহাবুবার রহমান, চট্রগ্রামের মিরসরাইয়ের উত্তর হাইত কান্দির মৃত আব্দুল কালামের পুত্র ইসমাইল, ময়মনসিংহের ভালুকার কাঠালীর আবেদ আলী খন্দকারের পুত্র মাহাবুব আলম, মৌলভীবাজার সদরের আনিকেলিবাড়ির মৃত আব্দুর রহমানের পুত্র আব্দুল বাছির, নারায়নগঞ্জের সিদ্দিরগঞ্জের জালকুড়ি পশ্চিমপাড়ার মৃত খিরত আলীর পুত্র রফিকুল হাসান,সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের কৈজুরি হাটের মৃত ছকির উদ্দিনের পুত্র আব্দুল হাকিম, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ার আলীপুরার মৃত হাকিম প্রধানের পুত্র জুলতাস আলম, নারায়নগঞ্জ বন্দরের কুড়িপাড়ার মৃত শামসুদ্দোহার পুত্র  আবুল হাসান, জিনাইদহের মৈলকুপার আতয়পুরের আসম আলী বিশ্বাসের পুত্র হাফিজুর রহমান, গোপালগঞ্জ সদরের তালাময়নাপাড়ার ছরোয়ার শেখের পুত্র আকরাম আলী শেখ, ঢাকার ধমারাইয়ের চৌহাটের মৃত রোমেজ উদ্দিনের পুত্র হারুন অর রশিদ মিয়া, ময়মনসিংয়ের গৌরপুরের কাশিমপুরের মৃত আব্দুর রহমানের পুত্র আবুল কালাম আজাদ, টাঙ্গাইলের ভ’য়াপুরের জগৎপুরের মৃত আব্দুল বাকীর পুত্র আব্দুল বারী, পাবনার বেড়ার কুশিয়ারার মোসলেম উদ্দিনের পুত্র  আব্দুল মতিন, বগুড়ার শাহজাহানপুরের জালসুকার মৃত ইব্রাহিম হোসেনের পুত্র ইউসুফ আলী, সিরাজগঞ্জের কামারখন্দেও মধ্যে ভদ্রঘাট নয়াপাড়ার আব্দুল কুদ্দুস তালকুদারের পুত্র শফিকুল ইসলাম, সিলেটের গোপালগঞ্জের রাফিপুরের শফিকুর রহমানের পুত্র আব্দুন শহিদ গোদন, সরাজগঞ্জের শাহজাহানপুরের মৃত বশির উদ্দিন সরকারের পুত্র রফিকুল ইসলাম , নোয়াখালির হাতিয়ার উত্তর বেজুগানিয়ার আব্দুল জলির মিয়ার পুত্র শাহিন এবং কুমিল্লার দেবিদ্বারের ধালাহাসের বীরমুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমানের পুত্র মহিউদ্দিন।

রংপুর জজ আদালাতের পিপি আব্দুল মালেক জানান, ডিসি অফিসের অফিস সহকারী সামসুল ইসলামসহ অপরাপর আসামীরা বেসরকারী আগ্নেয়াস্ত্র লাইসেন্স সংক্রান্ত সঠিক হিসাব গোপন করে, আগ্নেয়াস্ত্রের রেজিষ্টার গরমিল,অবৈধভাবে লাইসেন্স প্রস্তুত,অস্ত্র রাখার যোগ্যতাসম্পন্ন নয় এরুপ ব্যক্তির কাছে লাইসেন্স সরবরাহের ফলে অ¯্রধারীগন অবৈধভাবে অস্ত্র ক্রয় করে নিজ দখলে রেখে অবৈধ অস্ত্র গ্রহণে জড়িত হয়, এবং তা অবৈধভাবে নবায়ন করে ১৯৭৮ সালের অস্ত্র আইন (সংশোধিত ২০০২ এর ২২/১৯(ছ)/৫/১৯-(ক)/১৯(চ) ধারায় অভিযুক্ত।
২০১৭ সালের  ১৮ মে রংপুর ডিসি অফিসের অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর সামসুল ইসলামকে (৪৮) সহ বিভিন্ন জনের নামে ব্যাকডেটে ডিসির সই জাল করে, ভূয়া পুলিশ ভেরিফিকেশন দেখিয়ে দেশের বিভিন্নস্থানের মানুষের নামে বিপুল পরিমান আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ার অভিযোগে ওই দিনই রংপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মিন্টু বিশ^াস বাদি হয়ে সামসুল আলম ও পিন্টুর বিরুদ্ধে অস্ত্র আইন এবং সরকারী ক্ষমতার অপব্যবহার বিষয়ক আইনে দুটি পৃথক মামলা করেন। অবৈধ অর্থ উপার্জনের জন্য মামলা হয় দুদকে। গত ১৮ মে তার অফিসে অভিযান চালিয়ে সামসুলের আলমিরা থেকে ১৫টি ভূয়া আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স, ১৫ টি ভূয়া লাইসেন্সের ভলিউম, ৭ লাখ নগদ টাকা, ১১ লাখ টাকার এফডিআর ও ২  লাখ টাকার সঞ্চয় পত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় ওই দিনই ডিসি অফিসের জিএম শাখার সকল কাগজপত্র তাৎক্ষণিকভাবে সিলগালা করে দেয় জেলা প্রশাসন এবং অভিযুক্ত অফিস সহকারী সামসুল আলম ও পিয়ন পিন্টুকে বরখাস্ত করা হয়। ওইদিনই তিনি কৌশলে পালিয়ে আত্মগোপন করেছিলেন সামসুল। পরে ওই বছর ৫ জুলাই রাতে ঘটনা প্রকাশের ৫৯ দিন পর রাজধানীর নিউমার্কেট এলাকা থেকে র‌্যাব-১৩ একটি দল র‌্যাব-২ ও র‌্যাবের প্রধান শাখার গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় সামসুল আলমকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর সামসুলকে আদালতের মাধ্যমে ৭ জুলাই ৫ দিনের রিমান্ডে এবং ১১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় রিমান্ডে নেয় দুদক। ১৩ জুলাই রংপুর কোতয়ালী থানায় তার নামে অস্ত্র আইনে মামলা করেন এসআই মামুন। এরপর সামসুল ১৪ জুলাই আদালতে স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দি দেন। এছাড়াও রিমান্ডে তিনি এই চাঞ্চল্যকর ভূয়া অস্ত্রের লাইসেন্স প্রদান বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দেন। ওই বছর ১৮ সেপ্টেম্বর সামসুলের প্রধান সহযোগি টাঙ্গাইলের কালিহাতি উপজেলার চর বানিয়াকৈর এলাকার হায়েত আলীর পুত্র আব্দুল মজিদকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হয়। মজিদ সেনাবহিনীর ল্যান্স করপোরাল হিসেবে চাকরি থেকে অবসরগ্রহনের পর এলিট ফোর্স নামের একটি বেসরকারী সিকিউরিটি এজেন্সিতে চাকুরি করতো।  সেখান থেকেই সামসুলের সাথে একাট্রা হয়ে ডিসি রংপুর ডিসি অফিস থেকে অবৈধভাবে ভূয়া অস্ত্রের লাইসেন্সের বাণিজ্য করতো। পরবর্তীতে এ ঘটনায় ২৮১ জনের নামে চার্জশিট দেয়া হয়। এরপর  ভুয়া লাইসেন্স দেয়া অস্ত্রগুলো উদ্ধারের কাজ শুরু করে দুদক। ওই বছর ৩, ৭, ৮ ও ৯ আগষ্ট চার দফায় ৫৫ টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬১৩ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। এসব অস্ত্র রাজশাহী, দিনাজপুর ও ঢাকা থেকে কেনা হয়েছে এবং অধিকাংশই তুরস্কের। অস্ত্র ও গুলি ছাড়াও তাদের কাছে থাকা লাইসেন্সের কপিসহ অস্ত্র কেনার কাগজপত্রও জব্দ করা হয়েছে। রংপুর চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের মাধ্যমে অস্ত্র ও গুলি গুলো  ডিসি অফিসের ট্রেজারিতে জমা দেয়া হয়েছে।

 


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution