সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১১:৫০ পূর্বাহ্ন

এক মালি দো ফুল

আছেফুল হুদা,রংপুরঃ

এবার অন্যরকম একটি সম্পর্কের গল্প। একফুল দো মালির সেই প্রবাদ বাক্যটির ঠিক বিপরীত এবার। একফুল দো মালি। মালিকে পেতে দুই ফুলই এখন মরিয়া। মালির নাম মিজানুর রহমান বাবু। দুই ফুলের একজন আলেয়া আরেকজন রাবেয়া। এরমধ্যে আলেয়া অন্ত:স্বত্বা। শুক্রবার সকালে দুইজনই বিয়ের দাবিতে ঢাকা থেকে তারাগঞ্জের হারিয়ালকুঠি ইউনিয়নের সৈয়দপুর মুন্সিপাড়া গ্রামে বাবুর বাড়িতে এসে উঠেছেন বিয়ের দাবিতে। কিন্তু বাবুর পরিবার তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। শুক্রবার দিবাগত রাত সাড়ে ৩ টায় শত শত এলাকাবাসির দাবির মুখে বাবুর মা মেয়ে দুটিকে ফের বাড়িতে নিয়ে তুলেছেন। মেয়ে দুটি ঘটনাটি স্থানীয় চেয়ারম্যান এবং থানার ওসিকে বলেও এখনও কোন সুরাহা পান নি।

 

সরেজমিনে জানা গেছে, এই গল্পের নায়ক প্রেমিক মিজানুর রহমান বাবু রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সৈয়দপুর মুন্সিপাড়া এলাকার জহুরুল ইসলামের বড় পুত্র। তিনি ঢাকার গার্মেন্টসে চাকরী করেন। পাশাপাশি গার্মেন্টস শ্রমিকদের একটি মেসের ম্যানেজারির কাজ করেন। নিজের দুই ছোটভাইকে নিয়ে ঢাকার আমতলীতে থাকেন। এরমধ্যে দুটি মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। তাদের একজনের নাম স্বামী পরিত্যাক্তা আলেয়া বেগম (২৬)। আলেয়া জামালপুর জেলার মাদরগঞ্জ উপজেলার চন্নগড় আজহার আলীর মেয়ে। আলেয়া এখন ২ মাসের অন্ত:স্বত্বা। অপরজনের নাম রাবেয়া বেগম।  তিনি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালুককানুপুর ইউনিয়নের জামালপুর গ্রামের আবেদুর রহমানের মেয়ে। সাভাবের বাইপাইলের আমতলায় থাকতো তারা।  চাকরী করতো ইপিজেডে। দুই জনের সাথেই দীর্ঘ তিন বছর ধরে সম্পর্ক করে বাবু। আলেয়ার সাথে আমতলীর মেসে শারীরিক সম্পর্কের সময় এলাকাবাসির কাছে আটক হয়ে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রক্ষা পেয়ে মেস থেকে বাইরে এসে আলেয়াকে ফেলে রেখে গ্রামে পালিয়ে আসে বাবু। বাবুকে খুজতে গিয়ে মেসে ওই ঘটনা জানতে পারে রাবেয়া। এরপর আলেয়াকে খুজে বের করে রাবেয়া। তারপর দুজনই শুক্রবার সকালে বাবুর বাড়িতে এসে উঠে দুই প্রেমিকা।

 

শুক্রবার রাত সাড়ে এগারটায় বাবুর বাড়ির সামনে আনিছ মেম্বারের দোকানের সামনে প্রেমিকা রাবেয়া বেগম জানান, স্বামীর সাথে তালাক হয়ে যাওয়ায় আমি আমার এক সন্তানকে নিয়ে গার্মেন্টসে চাকরী শুরু করি। আমতলীতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকি। চাকরীর সময় আমার সাথে পরিচয় হয় বাবুর। সে আমাকে সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে আমি আমার আগের স্বামী ও সন্তানের কথা বলি। সে সব কিছু মেনে নিয়ে আমাকে বিয়ে করার প্রস্তাব দিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। দীর্ঘ ৩ বছর সে আমার সাথে স্বামী স্ত্রীর মতো মেলামেশা করেছে। বিয়ের কথা বললে সে বলে আমার বাড়িতে পাকা ঘর করার পর বিয়ে করবো। আমি তাকে বিশ্বাস করি। এরমধ্যে আমি আমার জমানো দুই লাখ টাকা তাকে ব্যবসার জন্য দেই। বেতনের টাকা থেকেও প্রতিমাসে তাকে ৩ থেকে সাড়ে তিনহাজার করে টাকা গত তিনবছর থেকে দিয়ে আসছি। কিন্তু সে আমার সাথে প্রতারণা করে আরও একটি মেয়ের সাথে একই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এটা আমি ভাবতেই পারছি না। বাধ্য হয়ে আমি তার বাড়িতে চলে এসেছি। আমাকে বিয়ে না করা পর্যন্ত এখান থেকে যাবো না।

 

অপর প্রেমিক আলেয়া বেগম (২৪) জানান, গার্মেন্টেস এ চাকরীর সুবাদে বাবুর সাথে আমার পরিচয় ও সম্পর্ক হয়। সে আমাকে তার মেসের মধ্যে রুম ভাড়া দেয়। সেখানেই আমরা স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে থাকি। তার ছোট দুই ভাইও আমাকে ভাবী বলে ডাকে। আমি বিয়ের কথা বললে সে গ্রামে ছাদ পেটানো দুই তলা বাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ি কমপ্লিট হলে আমাকে বিয়ের কথা জানায়। আমি তার ওপর বিশ্বাস করে তাকে স্বামী পরিচয় দিয়ে আমার গ্রামের বাড়িতে গত ঈদ-উল-ফিতরের ছুটিতে নিয়ে যাই। সেখানে জামাই হিসেবে আমার পরিবার তাকে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে। আমি ঈদের বোনাসসহ বেতনের ২৭ হাজার টাকা পাই। পুরো টাকাটাই আমি ওকে দেই। এছাড়াও গত একবছর থেকে আমি ১৬ হাজার ৫০০ টাকা বেতন পাচ্ছিলাম। আমার খরচ বাদে বাকী প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা ওর হাতে তুলে দিয়েছি। ঈদের ছুটির পর আমরা আবারও ঢাকায় বাসায় যাই। এসময় স্থানীয়রা আমাদের আটক করে। বিয়ের কাবিন নামা দেখাতে না পারায় স্থানীয়রা আমাদের আটকে রাখে। পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেখান থেকে ছাড়া পেয়ে অন্যবাসায় গিয়ে উঠি। কিন্তু রাতে বাবু আমাকে রেখে ওই বাসা থেকে পালিয়ে যায়। আমি এখন দুই মানের অন্ত:স্বত্বা। এরই মধ্যে রাবেয়া নামের এক আপু এসে আমাকে বলে আমাকেও সে বিয়ে করবে বলে ৩ বছর থেকে একই বাসায় থেকেছে। এরপর আমি ওই আপুকে নিয়ে তার বাড়িতে চলে এসেছি। আমাকে বিয়ে না করা পর্যন্ত আমি যাবো না। আমার সন্তানের স্বীকৃতির জন্য আমাকে বিয়ে করতেই হবে। যদি বিয়ে না কওে তাহলে আমি এখানে আত্মহত্যা করবো।

 

এলাকাবাসি জানিয়েছেন, শুক্রবার সকালে দুই প্রেমিকা বাবুর বাড়িতে উঠলে তার পিতা মাতা তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে নিজেরা পালিয়ে যায়। বাধ্য হয়ে ওই দুই প্রেমিক বাড়ির পশ্চিম পাশে আনিছুর মেম্বারের দোকানের সামনে এসে অবস্থান নেয়। রাত সাড়ে এগারটায় রাবেয়ার পিতা তার নিজ এলাকার মেম্বার ফিরোজ কবির ও রংপুর বারের আইনজীবি শাহ সুফি মো: আবু সাইদ ঘটনাস্থলে যান। সেখানে গিয়ে তারা কোনভাবেই বাবুর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে প্রথমে স্থাণীয় ইউপি চেয়ারম্যানকে বিষয়টি জানান।

 

এ্যডভোকেট আবু সাইদ জানান, বিষয়টি আমরা ইউপি চেয়ারম্যান বাবুলের সাথে দেখা করে প্রতিকার চাইলে তিনি বলেন এটা বিচারের এখতিয়ার তার নেই। থানায় যেতে হবে। সেখানে কোন বিচার না পেয়ে আমরা থানায় গিয়ে ওসি সাহেবের সাথে দেখা করি। তিনি জানান, আপনারা বিষয়টি স্থানীয়ভাবে মিমাংসার চেস্টা করেন। না হলে আমাদের জানাবেন। কারণ বিষয়টি ধর্ষন বিষয়ক।

 

আইনজীবি আবু সাইদ আরও জানান, থানা থেকে ফিরে এসে আমরা এলাকার লোকজনের কাছে বসেছি। বাবুর পরিবার থেকে কোন সাড়া পাওয়া যায় নি। রাত সাড়ে ৩ টায় বাবুর মা এসে মেয়ে দুটিকে ছেলের সাথে বিয়ে দেয়ার কথা বলে বাড়িতে নিয়ে তুলেছে। এখ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোন সুরাহা হয় নি। মেয়ে দুটি এখন ওই বাড়িতেই আছে। তবে ছেলে ও ছেলের বাবা পলাতক আছে।

দুজনের একসাথে বিয়ে সম্ভব কিভাবে এ প্রশ্নের জবাবে এই আইনজীবি বলেন, দুই মেয়েই যদি একে অপরের কাবিননামায় স্বাক্ষী হিসেবে সই করে তাহলে সেটা সম্ভব।

স্থানীয় সাবেক ইউপি মেম্বার ও এলাকার মুরব্বী আনিছার রহমান আনিছ বলেন, একই সাথে দুটি মেয়ে সম্পর্কেও দাবি নিয়ে এসেছে। এরমধ্যে একজন অন্ত:স্বত্বা। কিভাবে সমাধান টানা যায়, সেটা চেস্টা করা হচ্ছে। তবে বাবুর পরিবারের পক্ষ থেকে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। সমাধান না হলে মেয়ে দুটি আত্মহত্যার হুমকি দিচ্ছে।

এ্য ব্যাপারে স্থানীয় চেয়ারম্যান বাবুল জানান, আমার কাছে বিষয়টি এসেছিল। আমি বলেছি এটা ধর্ষনের ঘটনা। আমার বিচারের এখতিয়ার নেই। আমি পুলিশে যেতে বলেছি।

 

তবে সেখানে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, রাবেয়া নামের মেয়েটির কাছ থেকে নেয়া নগদ দুই লাখ সহ বিভিন্ন সময়ে নেয়া টাকা ফেরত দিয়ে তাকে বিদায় দিয়ে অন্ত:স্বত্বা আলেয়ার সাথে বাবুর বিয়ে দিয়ে বিষয়টি সমাধানের চেস্টা চলছে।

এ ব্যপাওে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ( বি সার্কেল) মারুফ জানান, বিষয়টি জানার পর সেখানে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ পেলে বিধি অনুুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ##

 

এনপিনিউজ/আছ/এএস


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution