বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:২৯ পূর্বাহ্ন

কারাগারে খালেদার এক বছর, মুক্তির ব্যাপারে নেতারা হতাশ

কারাগারে খালেদার এক বছর, মুক্তির ব্যাপারে নেতারা হতাশ

 এক বছর আগে জিয়া এতিমখানাট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় রায়ের পর খালেদা জিয়া কারাগারে গেলেও আপিল করেই জামিনে তার বেরিয়ে আসার আশায় ছিলেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু তা ঘটেনি, উপরন্তু আরেকটি মামলায় সাজার রায় এসে গেছে এর মধ্যে: আরও মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোয় আটকে গেছে মুক্তি; অংশ নিতে পারেননি একাদশ সংসদ নির্বাচনেও। এই অবস্থার মধ্যে পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন সড়কের পুরনো কারাগারে একমাত্র বন্দি হিসেবে এক বছর কেটে গেল সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার।
দলীয় চেয়ারপারসনকে যে এতদিন বন্দি থাকতে হবে, তা তখন ‘কল্পনাই করতে পারেননি’ বলে বৃহস্পতিবারই এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য আসে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী মওদুদ আহমেদের কাছ থেকে। তিনি বলেন, “কোনো দিন কল্পনা করতে পারি নাই যে বাংলাদেশের সবচাইতে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে একটা তুচ্ছ ভিত্তিহীন মামলায় সাজা দেবে। পাঁচ বছরের সাজায় আপিল ফাইল করার পর সাত দিনের বেশি উনার জেলখানায় থাকার কথা নয়।”
৩৬ বছরের রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার বন্দি থাকা নতুন নয়। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে গ্রেফতার হয়ে এক বছর সাত দিন বন্দি ছিলেন তিনি। তখন তাকে রাখা হয়েছিল সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে।  তবে সেবারের বন্দিদশার সঙ্গে এবারের পার্থক্য হচ্ছে এখন তিনি বন্দি আছেন দুর্নীতির দায়ে দোষি সাব্যস্ত হয়ে। তখন যে মামলাগুলোর হয়েছিল, তার একটি জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলা।
এতিমদের জন্য আসা দুই কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালে করা এই মামলায় ২০১৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে দোষি সাব্যস্ত করে ৫ বছরের সাজা দিয়ে রায় দেন ঢাকার জজ  জজ মো. আখতারুজ্জামান।  রায়ের পর ওইদিনই নাজিমউদ্দিন সড়কের ওই কারাগারে নেওয়া হয় ৭৩ বছর বয়সী খালেদা জিয়াকে। পুরনো ওই কারাগারে তাকে নেওয়ার পর তখনই প্রশ্ন তুলেছিলেন বিএনপি নেতারা। কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে তার জন্য কারাগারে সুবন্দোবস্তু করার কথা বলা হয়; এমনকি সেবার জন্য গৃহকর্মী ফাতেমা বেগমকে কারাগারে রাখতে পারার নজিরবিহীন সুযোগ পাওয়ার কথাও বলে সরকার।
এই মামলায় খালেদা আপিল করে কয়েক মাস পর জামিন পেলেও তার মুক্তি আটকে যায় অন্য বিভিন্ন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানোতে, যা তাকে আটকে রাখার ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগ তোলে বিএনপি। এর মধ্যেই ২৯ অক্টোবর হয়ে যায় জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলার রায়; এবার একই জজ মো. আখতারুজ্জামান এই দুর্নীতির মামলায় খালেদাকে দেন সাত বছরের সাজা।
তার একদিনের মধ্যে জিয়া এতিমখানা দুর্নীতির মামলায় আপিলের রায় আসে হাই কোর্ট থেকে। খালেদা জিয়ার বয়স ও অবস্থান বিবেচনায় নিম্ন আদালতের বিচারকে আখতারুজ্জামান তাকে কম সাজা দিলেও তাতে সায় দেয়নি হাই কোর্ট।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা ১০ বছর বাড়িয়ে হাই কোর্ট বলে,  “ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাকে (খালেদা জিয়াকে) সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ করার ক্ষেত্রে যাতে দ্বিতীয়বার ভাবতে হয়।”
কারাগারে এই এক বছর খালেদার চিকিৎসা নিয়ে নানা নাটকীয়তা ছিল আলোচনায়। শুরুতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে যেতে আপত্তি করলেও পরে তিনি সেখানেই থেকে কিছু দিন চিকিৎসা নেন। তাকে দুই বার চিকিৎসার জন্য বিএসএমএমইউতে নেওয়া হয়েছিল। প্রথমবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য গত এপ্রিলে। দ্বিতীয়বার নিয়ে ৬ অক্টোবর ৮ নভেম্বর তাকে রাখা হয়েছিল। পরে ফিরিয়ে নেওয়া হয় কারাগারে। এরপর অন্য মামলার বিচারে তাকে ওই কারাগারে স্থাপিত আদালতে তাকে দেখা গেছে হুইল চেয়ারে।
এই এক বছরে খালেদা জিয়ার ভাই-বোনসহ স্বজন এবং বিএনপি নেতারা দেখা করছেন তার সঙ্গে। তারা বলছেন, বিশাল ওই পুরনো কারাগারে ভুতুড়ে পরিবেশে বন্দি আছেন তাদের নেত্রী। এক স্বজন বলেন, “কারাগারে তিনি (খালেদা জিয়া) একেবারেই ভালো নেই। অসুস্থতার মধ্যেই তার সময় কাটে বই ও পত্রিকা পড়ে। নিয়মিত কোরান শরিফও পড়েন তিনি।  বেশিরভাগ সময় যুদ্ধ করতে হয় যন্ত্রণাদায়ক রোগ-ব্যধির সাথে।”
কারাগারের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, খালেদা জিয়া চুপচাপই থাকেন সব সময়। কিছু লাগবে কি না, জানতে চাইলে বলেন, ‘প্রয়োজন হলে’ জানাবেন।
কারাগরেই খালেদা জিয়ার খাবার রান্না করা হয়। বাসা থেকে কোনো খাবার কারাগারে নিতে দেওয়া হয় না। শুধু দুই ঈদের বাসার রান্না করা খাবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কারাগারে নিতে দেওয়া হয়েছিল।
কারাগারে জেল সুপারের কক্ষটিকে সংস্কারের পর ‘স্পেশাল জেল’ ঘোষণা করে সেখানেই খালেদাকে প্রথম দিন রাখা হয়েছিল। কয়েকদিন পর দোতলার একটি কক্ষে স্থানান্তর করা হয় তাকে, যা আগে কারাগারে ‘ডে কেয়ার সেন্টার’ হিসেবে ব্যবহার হতো।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের ভাষায়, সেই কক্ষটির অবস্থাও ভালো নয়। জরাজীর্ণ ও স্যাঁত স্যাঁতে অবস্থা। “এখানে এত বড় বড় ইঁদুর দৌড়ায়, এতগুলো বেড়াল ওখানে, যারা ইঁদুর ধরে। আপনারা শুনলে হতবাক হবেন যে, ম্যাডামের ঘরের মধ্যে ওই বেড়াল বড় ইঁদুর ধরেছে,” গত বছর বলেছিলেন তিনি।
স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ এক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর ১৯৮৩ সালে খালেদা জিয়া রাজনীতিতে আসেন। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়ে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ‘৮৪ সালের ৩ মে ও ‘৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিন দফায় বন্দি হয়েছিলেন তিনি। তবে তখন ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মইনুল সড়কের বাসায় গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছিল তাকে।
তার ২০ বছর পর বন্দি হলেও তিনি ছিলেন সংসদ ভবনের মতো স্থানে একটি বাড়িতে। কারাগারের কুঠুরীতে এবারই প্রথম গেলেন তিনি।
দুটি মামলায় রায় হওয়ার পর খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আরও অন্তত ৩৪টি মামলা রয়েছে বলে তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে নাইকো মামলা, গ্যাটকো মামলা, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি মামলার বিচার চলছে। এগুলো দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার সংক্রান্ত। বাকি মামলাগুলো রাষ্ট্রবিরোধী ও অপরাধজনিত মামলা। যানবাহনের আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা, সহিংসতা, নাশকতা, ভুয়া জন্মদিন পালন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কটুক্তির অভিযোগ সংক্রান্ত মামলা। এর মধ্যে ২৬টি মামলা হয়েছে ঢাকায়।  এছাড়া কুমিল্লায় তিনটি, পঞ্চগড় ও নড়াইলে একটি করে মামলা রয়েছে।
খালেদা জিয়া বন্দি থাকায় তার গুলশানের বাড়ি ‘ফিরোজা’ এখন জনশূন্য। নিরাপত্তাকর্মীরা নিয়মিত পাহারা দেন বাড়িটি। বাড়ির ভেতরের আঙিনা আগের মতোই দেখা গেছে, বাগানও রয়েছে ঠিক-ঠাক। ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমাই মূলত বাসাটি দেখাশোনা করেন।
খালেদা জিয়ার নামে এখনও যে চিঠি তার গুলশানের কার্যালয়ে আসে তা খোলা হয় না বলে দলটির নেতারা জানান। এইসব চিঠির মধ্যে রয়েছে- ঢাকার বিদেশি দূতাবাসগুলোর রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারদের শুভেচ্ছাপত্র। এছাড়া দলের তৃণমূল স্তরের নেতা-কর্মীরাও চিঠি লেখেছেন তাকে। চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, গত এক বছরে নয়শ’র বেশি চিঠি জমা হয়েছে।
কী করবে বিএনপি
খালেদা জিয়াকে ছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিএনপির ভরাডুবির পর দলের নেতা-কর্মী, সমর্থক এমনকি সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন বিএনপি তাহলে কী করবে। কারাগারে থেকেই খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব দেবেন না কি তার মুক্তির জন্য বিএনপি কঠোর আন্দোলনে যাবে। দলের মধ্যে এমন আলোচনাও আছে সরকার না চাইলে খালেদা জিয়ার মুক্তি কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সে ক্ষেত্রে বিএনপি কি খালেদা জিয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করবে। আর সেটা চাইলে কী দিয়ে হবে সেই সমঝোতা?
বিএনপির অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা একমত যে, আইনি পথে খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব না। তারা সে কথা প্রকাশ্যে বলেছেনও। এ প্রসঙ্গে আইনজীবী ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, সরকার চাইলেই কেবল খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব। বিএনপির অপর একজন আইনজীবী বলেন, রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করতে থাকলে খালেদা জিয়ার মুক্তি ‘অসম্ভব’। এ জন্য আগে সরকারকে ‘ম্যানেজ’ করতে হবে।
খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের দিন ৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং দলের স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ নেতারা আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিলেন। আর নিজের ‘সুবিধা’ বিবেচনা করে নয়াপল্টন কার্যালয়ে অবস্থান করা দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী গণমাধ্যম কর্মীদের প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।  রায় ঘোষণা হওয়ার পর রুহুল কবির রিজভী সংবাদ সম্মেলন করেন।  যেখানে তিনি যথারীতি সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেন এবং খালেদা জিয়ার জন্য নিজের আবেগ প্রকাশ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
দলের চেয়ারপারসন দুর্নীতির মামলায় সাজা পেয়ে কারাগারে, সেখানে বিএনপি বড় ধরনের কোনো জনমত তৈরি করতে পারেনি। তাদের দাবির প্রতি সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। বিএনপি বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল। মহানগর, ওয়ার্ড, বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় মিলিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীর অভাব নেই। কিন্তু খালেদা জিয়াকে কারাগারে নেওয়ার দিন দলের যুগ্ম মহাসচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেলের (বর্তমানে কারাবন্দী) নেতৃত্বে মগবাজারে একটি বিক্ষোভ মিছিল ছাড়া সারা দেশের কোথাও একটি বিক্ষোভ মিছিল করতে পারেনি দলটি।
আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ দেখতে চেয়েছিল খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করলে বিএনপির প্রতিক্রিয়া কী হয়? কিন্তু দেশে-বিদেশে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া না হওয়ায় আওয়ামী লীগ অনেকটাই সুবিধাজনক অবস্থানে চলে আসে। এ কারণে এরপর বিএনপি যে দাবিই করেছে, আওয়ামী লীগ তা অস্বীকার করেছে। নিজেদের সুবিধা মতো এবং পরিকল্পনা মতো আওয়ামী লীগ যা যা করতে চেয়েছে, সবই করতে পেরেছে। বিএনপির সংবাদ সম্মেলন নির্ভর প্রতিবাদ আওয়ামী লীগের জন্য সমস্যার কারণ হতে পারেনি।
নিরপেক্ষ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৩ সালের আন্দোলনের সময় সহিংসতা করে দেশব্যাপী সমালোচিত হয় বিএনপি। এরপর দলটি আন্দোলনের প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে। যে কারণে সহিংসতা, অবরোধ ও হরতালে দেখা যায়নি দলটিকে। এ ছাড়া খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দলের নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে আহ্বান জানান। এই বিষয়টিকে সামনে এনে বিএনপি বোঝানোর চেষ্টা করেছে, তারা কোনো সহিংসতা করতে চায় না।
বিএনপির যেকোনো কর্মসূচি ঘিরে বিপুল পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন, বিএনপির কর্মসূচি থেকে নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার এবং বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করে দলটির নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করেছে সরকার। গায়েবি মামলা, বিএনপির নেতাদের বাড়ি থেকে বের হতে না দেওয়া, ধরপাকড়, নির্যাতন ধীরে ধীরে দলটিকে পেছনে নিয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত ঘুরে দাঁড়ানোর মতো কোনো পরিস্থিতি দলটি সামনে আনতে পারেনি। রাজপথে খালেদা জিয়ার না থাকার অভাবটা এখন বিএনপি হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে বিএনপির নেতারা প্রতীকী অনশন, মানববন্ধন, সেমিনার, বিদেশি কূটনীতিকদের অবহিত করতে বৈঠক করা ছাড়া রাজপথে কোনো আন্দোলন করতে পারেননি। কিংবা একটি বিক্ষোভ মিছিল করে সরকারের মনোভাব বোঝারও চেষ্টা করেননি তারা। কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ না হলে মামলা হবে এমন চিন্তা দলটিকে রাজপথ থেকে দলীয় কার্যালয়ে আবদ্ধ করে ফেলেছে।
এ ছাড়া বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচিতে প্রথম শর্তে স্থান পেয়েছে একাদশ জাতীয় নির্বাচন। আর নির্বাচনের কথা বলতে গিয়ে তখন এসেছে ‘খালেদা জিয়াবিহীন নির্বাচন এ দেশে হতে দেওয়া হবে না’। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলন যে একটি বড় ইস্যু হতে পারে, সে বিষয়টিতে মনযোগ দেননি বিএনপির নেতারা। খালেদা জিয়াকে ছাড়া যে একাদশ জাতীয় নির্বাচন হলো, সেখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিএনপির অর্জন মোটে আটটি আসন। সেখানে বিএনপির বিরুদ্ধে মনোনয়ন ‘বাণিজ্যের’ মতো গুরুতর অভিযোগ তো আছেই। দেশের অন্যতম একটি বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি, যে দলটির সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য, কোনো বিষয় হিসেব রাখার জন্য, অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড এবং সর্বোপরি রাজনীতির হাওয়া কোন দিকে যাচ্ছে—এসব বিষয়ে সমন্বয় করার বা নজর রাখার কোনো সেল নেই। একই বিষয়ে দলের একেক নেতার একেক বক্তব্য দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ।
বিএনপির মাঠের এবং কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করেন, খালেদা জিয়া জেলে না থাকলে নির্বাচন নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা উঠত না। দলের মধ্যে অনৈক্য তৈরি হতো না। এর মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে বিএনপি যদি জাতীয় সংসদে যোগ দেয়, তাহলে খালেদা জিয়ার মুক্তি মিলবে! এমন সমঝোতার কথা উঠেছে দলের মধ্যে। যদিও এর কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি। দলটির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান মনে করেন, স্বার্থান্বেষী মহল এ ধরনের কথা রটাচ্ছে।
অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা সংসদে যাচ্ছেন না। বিএনপির মাঠের নেতারা বলছেন, বিএনপির উচিত খালেদা জিয়াকে মুক্ত করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ খালেদা জিয়াহীন বিএনপি কেমন হতে পারে, তা এই মুহূর্তে সহজে অনুমান করা যাচ্ছে।
খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য যেসব আইনজীবী কাজ করেছেন, তাদের মধ্যে প্রবীণ ও বিখ্যাত আইনজীবীও আছেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে তারাও সরকারের ‘অনিচ্ছা’, ‘প্রতিহিংসা’, ‘কূটকৌশল’—এসবের অভিযোগ এনেছেন এবং চেষ্টার জায়গায় ত্রুটি রেখেছেন। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় ১৯ মার্চ ২০১৪ সালে। ফৌজদারি কার্যবিধিতে অভিযোগ গঠনের সময় আসামিকে অব্যাহতি দেওয়ার একটি বিধান আছে। এ জন্য আসামিকে মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে আবেদন করতে হয়। খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা আবেদন করেননি।
তা ছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য সম্ভাব্য যত আইনি পথ আছে, সেখানে দলটির আইনজীবীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। খালেদা জিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের সময় তার লিখিত বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক, বিভিন্ন মামলায় আগেই খালেদা জিয়ার জামিন না নেওয়ার বিষয়টি কতটুকু যুক্তিযুক্ত হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্র: প্রথম আলো ও  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution