সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১০:৩৫ পূর্বাহ্ন

কুড়িগ্রামকে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের আবেগঘন ফেসবুক স্টাটাস

কুড়িগ্রামকে নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের আবেগঘন ফেসবুক স্টাটাস

ধরলার পাড়ে কৈশোর কাটিয়ে বাবার বদলিতে কুড়িগ্রাম ছাড়তে হয়েছিলো তাকে।

কর্মজীবনে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর বদলি হয়ে আবার কুড়িগ্রাম ছাড়তে হয়েছে।কুড়িগ্রাম নিয়ে নিয়ে ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্ট দিয়েছে রংপুর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মেহেদুল করিম। এনপি নিউজ  ৭১ পাঠকদের জন্য পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হল:

আজ ২৩ জুন , ঠিক দু’বছর আগে এরকম একটি দিনে আমার চাকুরী জীবনের সবচেয়ে প্রিয় স্টেশন কুড়িগ্রাম জেলাকে, সেখানকার সহজ সরল মানুষগুলােকে,সেখানকার নদী -চর ঘেরা অপরূপ প্রকৃতিকে,ভালােবাসামাখা অনেক স্মৃতিকে বিদায় জানিয়েছিলাম গাড়িতে যখন আসছিলাম তখন গাড়ির সবাই আমরা নীরবে চোখের পানি ফেলছিলাম, আমার বডিগার্ড মামুন, ও একটু শব্দ করে কাঁদছিলাে, আমি ধমক দিয়ে থামিয়ে বললাম, “এই, এরকম করছাে কেন?” কান্না ছোয়াচে , আসলে ওর কান্নার শব্দ আমাকেও শব্দ করে কাঁদতে বাধ্য করছিলাে, তাই ওকে ধমক দিয়েছিলাম
–আমার সাথে সাথে অনেক আপনজন গাড়ির পিছনে পিছনে রংপুর পর্যন্ত চলে এসেছিলাে —কিসের এই টান?
কেন এই কান্না? কেন এই চোখের জল? আমরা যারা সরকারি চাকুরী করি তারা একটা জায়গা থেকে একসময় বিদায় নিয়ে আরেকটি জায়গাতে চলে যাবাে এটাই নিয়ম এটা অবধারিত, এর জন্য মানুষিক প্রস্তুতি আমাদের সকলের থাকে —কিন্তু, কিছু বিষয় থাকে, কিছু জায়গা থাকে যেখানে বাস্তবতা, রীতি, নীতি, নিয়ম সবকিছুকে ছাপিয়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, কুড়িগ্রাম হলাে ঠিক এমনি একটি নাম আমার কাছে,এমনি একটি অনুভূতি আমার কাছে, এমনি একটি আবেগ আমার কাছে।
—যেখানে আমার পেশাগত মানুষিক শক্তি , প্রস্তুতি সবকিছুকে ছাপিয়ে আমাকে দুর্বল করে ফেলেছিলাে বিদায় বেলায় আমি অনেক চেষ্টা করেছি বিষয়টি অনুধাবনের , বিশ্লষণের—কেন কুড়িগ্রাম আমাকে এভাবে কাঁদায়, এ কি প্রকৃতির টান , কোনাে নির্দিষ্টজায়গার টান , কোনাে ব্যক্তির প্রতি আকর্ষণ , কোনাে প্রতিষ্ঠানের উপর ভালােবাসা নাকি সুদূর অতীতের কোনাে স্মৃতির নস্টালজিক আহ্বান নাকি কোনােটাই নয় –নাকি সবগুলাে কারণের একটি মিশ্র অনুভূতি উত্তর পাইনি ভালােবাসা এরকমই কোনও নির্দিষ্ট ব্যাখ্যার বেড়াজালে একে বাঁধা যায়না কোনও নির্দিষ্ট
কারণ এর কর্তৃত্ব করেনা – যুক্তি দিয়ে এর যথার্থতাও বােঝা যায়না —তাই হেরে যাই বারবার আমার বাবা আজ থেকে ৩৫-৩৬ বছর আগে কুড়িগ্রাম জেলা সদরের থানা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছিলেন, বাবার চাকুরীর সুবাদে আমাদের কুড়িগ্রাম যাওয়া —সেই
১৯৮৫ সালের দিকে আমি তখন বারাে-তেরাে বছরের টগবগে কিশাের, অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র , বছরের মাঝামাঝি যাওয়াতে সরকারি স্কুল এ ভর্তি হতে না পেরে জায়গা হলাে খলিলগঞ্জ স্কুল এ —সেই খলিলগঞ্জ স্কুল, স্টেশন এর ভিতর দিয়ে ফুড গােডাউন কোয়ার্টার থেকে হেটে হেটে স্কুল এ যাওয়া , বন্ধু বান্ধব , ধরলা নদী, নৌকা , গ্রামীণ পরিবেশ, রেল লাইন সবকিছু যেন আমার প্রাণের
স্পন্দন হয়ে উঠলাে , মিশে গেলাম সবকিছুর সাথে -আড়াই বছর পর বেজে উঠলাে বিদায়ের সুর , তখন দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম, আব্বা যখন এসে বললাে বদলি হয়েছে , চলে যেতে হবে , মনটা মুহূর্তেই কেমন মলিন হয়ে গিয়েছিলাে —কিছুতেই আসতে ইচ্ছাকরছিলােনা, স্কুল এর স্যাররা বলছিলাে তােকে আমাদের কারাে বাসাতে রেখে দিবাে – আমিও মনে মনে রাজি ছিলাম –কিন্তু , আমার আর থাকা হয়নি দু হাজার উনিশ সালের মতাে , ১৯৮৭ এর কোনও এক সময় আমাকে কুড়িগ্রাম কে বিদায় জানাতে হয়েছিল–সেদিনও খুব কেঁদেছিলাম—বিশেষ করে , আমার পােষা কুকুর লর্ডকে ছেড়ে আসতে —ও সবসময় আমার স্কুল থেকে ফেরার সময় স্টেশন থেকে গার্ড অফ ওনার দিয়ে আমাকে বাসায় নিয়ে যেতাে —সম্পূর্ণ কুচকুচে কালাে, অদ্ভুত সুন্দর , স্মার্ট ছিল (কোথাও অন্য কোনও রং ছিলােনা) কুকুরটা আমাকে আগলে রাখতাে,মাঝরাতে/ভােরে যখন পড়তে উঠতাম, কোথা থেকে ও
ছুটে আসতাে কাছে —কি অকৃতিম ভালােবাসা —ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলাম, আম্মার কাছে বায়না ধরেছিলাম ওকে নিয়ে আসার জন্য —
কিন্তু , সেটা আর হয়নি —আমাদের মাল ভর্তি ট্রাকের পিছনে পিছনে সে ত্রিমােহনী পর্যন্ত ছুটে এসেছিলাে —এখনাে সেই স্মৃতি
জ্বলজ্বল করছে, ঠিক সেদিন আমার কেন জানি মনে হচ্ছিলাে বার বার আমি বােধয় কোনও একদিন আবার কুড়িগ্রামে ফিরবাে —যখন আমি এসপি হলাম তখন আমার প্রত্যাশা আরও বেড়ে গেলাে—মােটামুটি নিশ্চিত লাগতাে —যে ,একদিন আমি আমার সেই কুড়িগ্রামের এসপি হবাে , সেখানকার মানুষদের জন্য কাজ করবাে মন থেকে চাইলে কোনও কিছু অবশ্যই পাওয়া যায়
—-আমি শেরপুর জেলার এসপি থেকে কুড়িগ্রাম জেলার এসপি হিসেবে বদলি হই– মুহূর্তেই আমি ফিরে
গিয়েছিলাম ১৯৮৭ এর সেই দিনে —- অনেক আবেগ,অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি, অনেক কল্পনা, অনেক আনন্দ, অনেক কাজ —–কুড়িগ্রাম কে ঘিরে — যা
এখনাে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে – আর যে জন্যই হয়তাে মাঝে মাঝেই ছুটে যাই কুড়িগ্রামে মাঝে মাঝে যাহহ —-মুহুতেই আমাযমে গিয়েছিলাম ১৯৮৭ এর সেই দিনে —- অনেক আবেগ, অনেক গল্প, অনেক স্মৃতি , অনেক কল্পনা, অনেক
আনন্দ, অনেক কাজ —–কুড়িগ্রাম কে ঘিরে — যা এখনাে আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে আর যে জন্যই
হয়তাে মাঝে মাঝেই ছুটে যাই কুড়িগ্রামে – মাঝে মাঝে মনে হয়, এর আগে কেউ কি কখনাে এখান থেকে বদলি হয়ে যাওয়ার পরেও এতবার এসেছিলাে ? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কারাে একবারও যাওয়া হয়না —-
আমার মতাে হয়েছে আমার মেয়ে মানহা মাঝে মাঝেই বলে –“পাপা, কুড়িগ্রাম থেকে কেন বদলি হয়ে আসলে?
আবার ট্রান্সফার নাও না –চলাে , কুড়িগ্রাম যাই
“— অবুঝ বাচ্চা আমার –ও কি আর বােঝে –অন্য যেকোনাে কারণে হলেও , চাকুরী করতে আর হয়তাে কোনােদিন কুড়িগ্রাম যাওয়া হবেনা, -তবু, তুমি রবে নীরবে —-আমার অবুঝ আবেগ ও কাজে —
প্রিয় কুড়িগ্রামবাসী , Please, আপনারা সকলে সাবধানে থাকবেন , স্বাস্থবিধি মেনে চলবেন — আপনাদের ভালােবাসা মাখা স্মৃতি আজীবন আমাকে অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে
আপনাদের সবার জন্য আমার দোআ ,
ভালােবাসা ,শুভ কামনা সবসময়।


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution