বুধবার, ১৬ Jun ২০২১, ০৬:২৫ পূর্বাহ্ন

গাড়ি চলে ঢাকায় আর অভিযোগ দিতে হয় ভারতে

গাড়ি চলে ঢাকায় আর অভিযোগ দিতে হয় ভারতে

ওবায়দুর রহমান,ঢাকাঃ

নাগরিক জীবনের পরিবহন সমস্যা সমাধানে আশার আলো দেখিয়েছিল বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস। দেশে যেসব প্রতিষ্ঠান এ সার্ভিস দিচ্ছে তার মধ্যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান উবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। তবে বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির সার্ভিসের বিষয়ে গ্রাহকদের অভিযোগ বাড়ছে। অ্যাপভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠানের সেবা নেওয়ার সময় কোনও যাত্রী হয়রানির শিকার হলে দেশেই যে অভিযোগ করবেন, সে উপায় নেই। দেশের বিভিন্ন সড়কে উবারের গাড়ি দাপিয়ে বেড়ালেও, পুরো সেবা প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করা হয় ভারত থেকে।

ভুক্তভোগী উবারের যাত্রী ও চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাহ্যিকভাবে কোনও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা নেই উবারে। এ নিয়ে দেশে উবারের হয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা দেখিয়ে দেন ভারতে অবস্থিত উবারের অফিসকে। দেশের গ্রাহকদের সেখানে গিয়ে অভিযোগ করা সম্ভব না। এর ওপর উবারের নিত্য নতুন আইনে বিভ্রান্ত চালক-যাত্রী উভয় পক্ষই। ফলে প্রতারিত হচ্ছেন গ্রাহকরা।

উবার চালকদের বিরুদ্ধে গন্তব্য শুনে যাত্রা বাতিল করা, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, এক জনের ট্রিপ নিয়ে অন্য কাউকে গাড়িতে তোলা ও যাত্রাপথে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়ার মতো অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, নারী যাত্রীদের সঙ্গে বখাটেপনা ও যৌন হয়রানির অভিযোগও আছে।

যাত্রীদের অভিযোগ, কেউ হয়রানির শিকার হলে তাকে অ্যাপের মাধ্যমে অভিযোগ করতে হয়। তবে অ্যাপের মাধ্যমে কীভাবে অভিযোগ করতে হবে, তাও অনেক গ্রাহক জানেন না। তাই উবার কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ যাচ্ছে কম, বাড়ছে অসন্তোষ।

গত ২ মে সুজিৎ মোস্তাফিজ নামে একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী তার অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘উবার ও সিএনজি চালকদের মধ্যে আর কোনও পার্থক্য পাচ্ছি না। রাইড কল করলে প্রায় প্রত্যেক উবার চালক জানতে চান, কোথায় যাবো। আমি যদি বলি এটাতো আপনার জানার কথা পরে, এটাতো সিস্টেম না। একজন চালক বললেন, এটা আমার সিস্টেম, বলে ফোন কেটে দিলেন। বেশিরভাগ চালক গন্তব্য পছন্দ না হলে ট্রিপ ক্যানসেল করছেন। তাহলে এটা কেমন সার্ভিস। কারও কাছে উবার কর্তৃপক্ষ, ঢাকার কোনও ফোন নম্বর থাকলে প্লিজ জানান। আমি সরাসরি তাদের বক্তব্য জানতে চাই।’

বিষয়টি নিয়ে গত ৬ মে তিনি আবারও স্ট্যাটাস দেন। তাতে তিনি লেখেন, ‘চালকদের ব্যবহার নিয়ে কোথায় নালিশ করবো বুঝছিলাম না। স্ট্যাটাস দেওয়ার পর অনেকেই হেল্প লাইনের নম্বর জানালেন। সেখানে ফোন করে দেখি কাস্টমার কেয়ার বলে ঠিক তেমন কিছু নেই। যাই হোক, একটা অপশনে কমপ্লেইন করতে গেলে বললো, আমরা শুধু ড্রাইভারদের সমস্যা শুনি, ক্লায়েন্টদের না। ক্লায়েন্টদের অভিযোগ হেল্প অপশনে গিয়ে করতে হবে। সেখানেও আবার অপশন বেঁধে দেওয়া। অর্থাৎ, উবার যা সাজেস্ট করছে তার বাইরে অভিযোগ জানানোর স্কোপ নেই। আমি জোর করেই ড্রাইভার কমপ্লেইন সেকশনে বললাম, চালক ট্রিপ রিফিউজ করছে ক্রমাগত।’

রাজধানীর একটি ইস্যুরেন্স কোম্পানিতে চাকরি করেন আবুল হায়াত। তিনি গত ৩ জুন এক প্রবাসী আত্মীয়কে স্বাগত জানাতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যেতে পল্টন থেকে উবারের গাড়ি কল করেন। তবে চালক তাকে বহন করে কিছুদূর যাওয়ার পর, আর যাবেন না বলে জানিয়ে দেন। এসময় তাকে রাস্তায় নামিয়ে দেওয়া হয়।

আবুল হায়াত বলেন, ‘আমাকে নেমে যেতে বলা হলে আমি নেমে যাই। কারণ, গাড়ি তার। যদি অন্য কোনও ঝামেলায় ফেলে, সে কারণে নেমে গিয়ে রাইড ক্যানসেল করি। কিন্তু ওই চালকের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ করতে পারিনি। কোথায় করবো? কীভাবে করবো?’
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিকার চাইতে হলে যাত্রীকে ভারতে অবস্থিত উবারের অফিসে যোগাযোগ করতে হবে। যা বেশির ভাগ যাত্রীই করেন না। বাংলাদেশে অনেক আগে ব্যবসা শুরু করলেও এখনও নিজস্ব কোনও অফিস স্থাপন করেনি উবার।
তোফাজ্জল হোসেন নামে একজন বেসরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘নানা কাজে প্রায়ই উবারের প্রয়োজন হয়। কিন্তু চালকরা ফোন করে জানতে চান কোথায় যাবো। তাদের গন্তব্য পছন্দ না হলে রাইড বাতিল করে দেন। এতে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সময় যেমন নষ্ট হয়, তেমনি পড়তে হয় ভোগান্তিতে।
যাত্রীদের অভিযোগগুলো নিয়ে উবারের বাংলাদেশি পিআর এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখানকার এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশে উবারের কোনও প্রতিনিধি নেই। যদি কারও কোনও জিজ্ঞাসা থাকে, তাহলে আমাদেরকে মেইল করতে পারেন। আমরা সেটি ওদেরকে পাঠিয়ে দেবো। দুই দিনের মধ্যে এর জবাব আসবে।’

তিনি আরও জানান, উবারের চালক বা যাত্রী যারই সমস্যা হোক না কেন, অ্যাপের মাধ্যমেই তা জানাতে হয়। তখন উবার কর্তৃপক্ষ সেগুলো যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা নেয়। যদি চালক প্রথমবার ভুল করে থাকে, তাকে সতর্ক করা হয়। অফিসে নিয়ে প্রশিক্ষণ করানো হয়। বারবার একই ভুল করলে, তখন তার রেজিস্ট্রেশন বাতিল করা হয়। আর উবারের যে হটলাইনটি রয়েছে সেটি শুধু যারা চালক হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করতে চায় তাদের জন্য। পুরো বিষয়টি ভারত থেকেই অপারেট করা হয়।

তবে রাইড শেয়ারিং নীতিমালায় বলা আছে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে বিআরটিএ’র তালিকাভুক্তির সনদ নিতে হবে। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম থাকলে যাত্রীরা তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারবেন। আর সেই অভিযোগ নিষ্পত্তির পরে যাত্রীদের তা জানানো হবে। কিন্তু উবার কর্তৃপক্ষ এমন কোনও ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা তা জানা যায়নি।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) সড়ক নিরাপত্তা বিভাগের পরিচালক মাহবুব-ই-রাব্বানী বলেন, আসলে অ্যাপভিত্তিক গাড়ির চালকদের দুর্ব্যবহারের বিপরীতে তেমন কিছু করার নেই। যাত্রীরা সমস্যায় পড়লে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অভিযোগ জানাতে পারে। সেক্ষেত্রে তারা চালকের কানেকশন বাতিলসহ অন্যান্য ব্যবস্থা নেবে। আর গুরুতর অভিযোগ থাকলে আমাদের কাছে অভিযোগ করলে আমরা দোষী চালকের লাইসেন্স বাতিল করতে পারি।

এনপিনিউজ/আশিক/বা/টি


© All rights reserved © 2020-21 npnews71.com
Developed BY Akm Sumon Miah