মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৬:১৭ পূর্বাহ্ন

বাংলার প্রতি অবহেলায় মন কাঁদে ভাষা সৈনিক আনিসুলের

বাংলার প্রতি অবহেলায় মন কাঁদে ভাষা সৈনিক আনিসুলের

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু পূর্ব ও পশ্চিম প্রদেশে ভাগ হওয়া পাকিস্তানে দেখা দেয় নতুন সমস্যা। পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) বাংলাভাষীদের উপর উর্দুকে রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী।

১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ভাষণে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন- ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।‘ তার এই ভাষণের সাথে সাথে উপস্থিত ছাত্র-জনতা প্রতিবাদ শুরু করেন। সেই দিন থেকেই শুরু হয় ভাষার জন্য আন্দোলন। এই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তানজুড়ে। রংপুরেও একই সময় থেকে দানা বাঁধে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন। ২২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রংপুর কারমাইকেল কলেজে বিক্ষোভ মিছিল করেন ছাত্ররা।

১৯৫২ সালের সেই একুশে ফেব্রয়ারি থেকেই ক্রমে ধাবিত হয়েছিল মুক্তির সংগ্রাম তথা স্বাধীনতার আন্দোলন। ভাষা আন্দোলনে সারাদেশ যখন উত্তাল সেই সময় বসে ছিলেন না রংপুরের দামাল ছেলেরাও। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে তারা রাজপথে মিছিল-মিটিং সমাবেশে জানিয়েছিলেন তীব্র প্রতিবাদ।

এই প্রতিবেদকের কাছে এভাবেই ৬৭ বছর আগের ভাষা সংগ্রামের স্মৃতিময় দিনগুলোর কথা জানান রংপুরের ভাষা সৈনিক মীর আনিসুল হক পেয়ারা।

১৯৫২’র স্লোগানমুখর সেই দিনগুলো কাঁদায় ভাষা সৈনিক মীর আনিসুল হক পেয়ারকে। তাঁর এই কান্না বাংলা ভাষার ব্যবহার, বিকৃতি আর উচ্চারণে বর্তমান প্রজন্মের অবহেলা দেখে। বাংলাকে সর্বক্ষেত্রে সার্বজনীন হিসেবে দেখে যেতে চান এই ভাষা সৈনিক।

সদা হাস্যোজ্জ্বল এই ভাষা সৈনিকের মুখে এখন আর হাসি নেই। তিনি গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হন। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর থেকে বাসায় শয্যাশয়ী হয়ে পড়ে আছেন আনিসুল।

ধবার (২০ ফেব্রুয়ারি) রংপুর মহানগরীর মাহিগঞ্জ আফানউল্লাহ্ রোডের আমেনা কুঠিরে তাঁর সাথে কথা হয় বার্তা২৪.কমের প্রতিবেদকের। এ সময় দীর্ঘক্ষণের আলাপচারিতায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট স্মৃতিচারণ করেন এই ভাষা সৈনিক।

আনিসুল হক পেয়ারা জানান, রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে মিছিলে যাওয়ার জন্য রংপুর জিলা স্কুল থেকে তাঁকে বের করে দেওয়া হয়। পরে আদর্শ স্কুল থেকে মেট্রিক পাস করে ১৯৫২ সালে কারমাইকেল কলেজে ভর্তি হন। ঐ সময় কারমাইকেল কলেজের অবাঙালি অধ্যক্ষ শাহাবউদ্দিন ভাষা আন্দোলনের পক্ষে ছিলেন না। ছাত্রদের মিছিল, সভা-সমাবেশ করতে দিতেন না উর্দুভাষী এই অধ্যক্ষ।

১৩৫৮ বঙ্গাব্দের ৮ ফাল্গুন। আগুনঝড়া ফাগুনের এই দিনটি ছিল ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি। সেদিন ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি ছিল। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে সেই দিন রাজপথে নেমে ছিলেন ছাত্র-শিক্ষক ও সাধারণ জনতা।

মিছিলে বৃষ্টির মতো চলে গুলিবর্ষণ। এই খবর সন্ধ্যার দিকে ছড়িয়ে পড়ে রংপুরে। বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ এর প্রতিবাদে ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রাত থেকেই সংঘবদ্ধ হতে থাকে।

আনিসুল জানান, পরেরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি কারমাইকেল কলেজে প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভা শেষে মিছিল নিয়ে শহরের দিকে এগুতে থাকে ছাত্রজনতা। মিছিলটি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পার হয়ে তেঁতুলতলার কাছাকাছি এলেই পুলিশ ছত্রভঙ্গ করতে উদ্যত হয়।

সেই সময় পুলিশি বাঁধা উপক্ষো করে ছাত্র-জনতার স্লোগানমুখরিত প্রতিবাদের মিছিল শহরের ভেতরে পৌঁছে যায়। সেদিন পুলিশের বেধড়ক লাঠিচার্জের কাছে মাথা নত করেনি ছাত্র-জনতা।

আনিসুল বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় হওয়ার কারণে ৫২’র পরে আমার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়। এক পর্যায়ে আত্মগোপনে যাই। এ কারণে ১৯৫৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারিনি। পরে ১৯৫৫ সালে পরীক্ষা দিই। ১৯৫৬ সালে আবার পলাতক হতে হয়।‘

সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘রংপুরে ভাষা আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলো কারমাইকেল কলেজ। আন্দোলনে তখন নেতৃত্ব দিতেন মতিউর রহমান, আলতাব হোসেন, মোহাম্মদ আফজাল, আজিজুর রহমান, সুফি মোতাহার হোসেন, তোফাজ্জল হোসেন, শাহ আবদুর রাজ্জাক, আশরাফ হোসেন বড়দা, শামসুল হুদা, শাহ আবদুল বারী, শাহ তবিবর রহমান প্রধান সহ অনেকে। যাদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। আর যারা আছেন, তাদের খোঁজ কেউ রাখেন না। শুধু ভাষার মাস এলেই খোঁজ পড়ে আমাদের।’

দামাটি দিয়ে শহীদ মিনার তৈরির স্মৃতি তুলে ধরে তিনি জানান, ১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি এক রাতের শ্রমে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে কাঁদামাটি দিয়ে তৈরি হয় প্রথম শহীদ মিনার। সেই কাঁদামাটির শহীদ মিনার আজও স্মৃতিপটে ভেসে উঠে। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনারারা শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলে। স্বাধীনতার পর ঐ জায়গাতেই নতুন করে শহীদ মিনারটি নির্মিত হয়।

আনিসুল ১৯৬১ সালে মাহিগঞ্জ আফানউল্ল্যাহ উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এরপর ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলনের সময় জেল খাটেন দুই মাস। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে একাত্তরে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়ে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন সাহসী এই মানুষটি।

আনিসুল হকের পাঁচ সন্তানের মধ্যে চার মেয়ে ও একজন ছেলে। স্ত্রী নূরজাহান বেগম ২০১৪ সালে মারা গেছেন। ছেলে-মেয়ে সবারই বিয়ে হয়েছে। এদের মধ্যে বড় মেয়ে ইফফেতারা বিনতে আনিস লুবনা রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, দ্বিতীয় মেয়ে ইসমেত আরা বিনতে আনিস লুমা বেসরকারি ইন্সুরেন্স কোম্পানিতে কর্মরত, ছেলে মীর ইফতেখারুল হক পল্লব ব্যবসা করছেন। আর বাকি দুই মেয়ের মধ্যে শামীম আরা সুলতানা রাজশাহীর চারঘাটে সরকারি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এবং ছোট মেয়ে শাহিনা সুলতানা রংপুর জিলা স্কুলে শিক্ষকতা করছেন।

বর্তমানে পরিবারের অন্যদের পাশাপাশি অসুস্থ শ্বশুরের সেবাযন্তে ব্যস্ত সময় পার করছেন ছেলের বউ রাবেয়া খাতুন শিল্পী। তিনিজানান, এ মাসে রংপুর ও কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা শয্যাশয়ী আনিসুল হক পেয়ারার খোঁজখবর নিতে বাসায় এসেছিলেন।


© All rights reserved © 2020-21 npnews71.com
Developed BY Akm Sumon Miah