বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ০৯:২৩ পূর্বাহ্ন

মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন প্রতাব সরকার

মানুষের জীবন নিয়ে খেলছেন প্রতাব সরকার

আল আমীন সুমন  রংপুর
 অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তবতা হচ্ছে রংপুরের গংগাচড়া উপজেলা সদরে থানা এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের  মাঝখানে দীর্ঘ ৬ বছর ধরে চলছে ‘গঙ্গাচড়া ডায়াগনষ্টিক সেন্টার নামের একটি প্রতিষ্ঠান। সেখানে প্রতাব সরকার নামের এক যুবক নিজেই ডাক্তার, নিজেই সনোলোজিষ্ট, নিজেই মেডিকেল টেকনোলোজিষ্ট, নিজেই ম্যানেজার ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়ে সব কিছুই করছেন।
একেক কাগজে একেক ধরনের সই করছেন। অসহায় রোগিদের সাথে এই প্রতারণার কারবার করছেন তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়েই। তার সম্বল বলতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে করা আবেদন পত্র। সরেজমিন অনুসন্ধানে পাওয়া গেলো এসব চাঞ্ছল্যকর তথ্য। অবশ্য স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন বলছে তারা এই প্রতারনা বিষয়ে কিছুই জানেন না।
 শনিবার সন্ধায় সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেলো। গঙ্গাচড়া উপজেলা সদরের থানা মোড় থেকে ২০ গজ পূর্বে এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ১০০ গজ পশ্চিমে গঙ্গাচড়া ডায়গনস্টিক সেন্টার নামের এই প্রতিষ্ঠান।
লাইটিং সাইন বোর্ডে প্রতিষ্ঠানের নাম ছাড়াও বকুল নামের একজন চিকিৎসক,  টেকলোজিস্টেও নাম। মাঝে মেডিক্যাল টেকলোজিস্ট নামের মালিক প্রতাব সরকার। অনুসন্ধানের সত্যতা যাছাইয়ের জন্য রংপুর থেকে প্রকাশিত আমাদেও প্রতিদিন নামের একটি পত্রিকার স্টাফ রিপোর্টার শরিফুল ইসলাম পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ওই ডায়গনস্টিক সেন্টারে পাঠানো হলো।
ঢুকেই রিসিপশনে থাকা শিরিনা নামের এক মহিলার মুখোমুখি। তিনি জানতে চাইলেন কি করবেন। শরিফুল আলট্রাসনোগ্রাম হয় কিনা জানতে চাইলে মহিলা বললেন কে করাবে আলট্রাসনোগ্রাম। পেগনেন্ট মহিলা না অন্য কেউ?  শরিফুল তাকে বলেন, আমি নিজেই করবো। আমার পেটে প্রচন্ড ব্যাথা। তখন শরিফুল মহিলাকে বলেন, আমার ভাইয়ের কাছে টাকা আছে। তাকে ডাকছি। তখন শরিফুল আরেক সাংবাদিক আল-আমিন সুমনকে ডেকে নেন।  আলট্রাসনোগ্রাম করার জন্য ৩৫০ টাকা দরদাম ঠিক করে টাকা দিয়ে রিসিভ কওে নেন। তারপর শরিফুল ইসলামকে আলট্রাসনোগ্রাম রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে বসে আছেন প্রতাব সরকার নামের সেই সজ জান্তা। আলট্রাসনোগ্রাম করার এক পর্যায়ে প্রতাব সরকার বলেন, খালি পেট না থাকায় কোন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতাব সরকার এবার প্রসাব পরীক্ষা করা জন্য বলেন। সেজন্য আলাদাভাবে  আবার ১০০ টাকার রিসিভ কাটেন। প্রসাব পরীক্ষার পর প্রতাব সরকার বলেন, এবার রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। এসময় শরিফুল রক্ত পরীক্ষা করতে না চাইলে প্রতাপ সরকার বলেন, পরবর্তীতে রক্ত পরীক্ষা করে নিবেন আপনার ডায়াবেটিস আছে। এরপর প্রতাব সরকার বলেন, আমি প্রেসসক্রিপশন করে দিচ্ছি সব ঠিক হয়ে যাবে। এরপর তিনি কম্পিউটার ওপেন করে প্যাড বের করেন। দুটি প্যাডে আগে থেকেই রিপোর্ট  তৈরি করা ছিলো।
সেখানে শুধু নাম পরিবর্তন করে নিজ হাতে একবার মেডিক্যাল টেকনোলোজিস্ট এবং একবার ক্লিনিক্যাল সনোলোজিস্ট নামের দুটি রিপোর্ট প্রদান করলেন। আল্ট্রাসনোগ্রামের প্রিন্ট কপি দিলেন। এরপর সাদা কাগজে  ব্যবস্থাপত্র লিখে দিয়ে ওষুধগুলো কিনতে বললেন।
এরপর ওই ক্লিনিকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এভাবে রোগিদেও সাথে প্রতারণার কথা জানতে চাইলে প্রতাব সরকার বলেন, আমি কি করবো। ডিপ্লোমা টোকনোলোজিষ্ট  পাশ করেছি। চাকুরী না পেয়ে গত ৬ বছর ধরে এই কাজ করছি। নিজেই চিকিৎসক, সনোলোজিস্ট এবং টেকনোলোজিস্টের স্বাক্ষর দিয়ে রোগিদেও প্রতারনা করার বিষয়ে তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতার আলোকে আমি এটা দিতে পারি।
 ডায়গনোস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য লাইসেন্স আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দেয়া লাইসেন্সের জন্য একটি আবেদনের কপি দেখান। সেই প্রেক্ষিতে  রংপুর সিভিল সার্জন গত ১২/০২/১৮ ইং তারিখে ডায়াগোনোস্টিক সেন্টারটি পরিদর্শন করেন। ওই পরিদর্শনের পর কোন রিপোর্ট গত একবছরেও দেয়া হয় নি। কিন্তু প্রতাব সরকার সিভিল সার্জনের পরিদর্শনকেই তার লাইসেন্স বলে দাবি করেন।
 ল্যাবটি ঘুরে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ি একটি ডায়াগোনোস্টিক সেন্টার প্রতিষ্ঠার জন্য বিধি অনুযায়ি চিকিৎসক, এমটি (ল্যাব), ম্যানেজার, ল্যাব এ্যটেনডেন্ট, আয়া, ক্লিনার অন্যান্য কর্মচারী, যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা থাকা দরকার তার কিছুই নেই ওই ল্যাবটিতে। সাইনবোর্ডে যে চিকিৎসকের নাম আছে তাকেও পাওয়া যায় নি। তিনি আসেননও না সেখানে। তবে প্রতাব সরকার ছাড়া সোহেল নামে একজন ডেন্টাল টেকনোলোজিস্ট দাবিদার যুবক এবং শিরিনা নামের এক মহিলাকে পাওয়া গেছে।
 বিষয়টি জানতে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ গওছুল আজিম চৌধুরী বলেন, ওই ডায়াগোনোস্টিক সেন্টারটি সিভিল সার্জন পরিদর্শন করার পর কোন রিপোর্ট দেন নি। কিন্তু সেখানে যে কিছুই নেই। সেটা আমার জানা ছিল না। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহন করবো।
 তবে রংপুর সিভিল সার্জন ডাঃ জাকিরুল ইসলাম বলেন, আমি আমার মায়ের অসুস্থ্যতার কারণে ঢাকায় চাচ্ছি। ঢাকা থেকে ফিরে এসে অনুমোদনবিহীন ব্যবস্থা নিব।


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution