বৃহস্পতিবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, ১০:৪৩ পূর্বাহ্ন

রংপুরের মিঠাপুকুরে এমপি পুত্রের নাম ভাঙ্গিয়ে হিউম্যান এন্ড নীডস ভূয়া এনজিওর নামে দেড় কোটি টাকা আত্মসাত করে উধাও

রংপুরের মিঠাপুকুরে এমপি পুত্রের নাম ভাঙ্গিয়ে হিউম্যান এন্ড নীডস ভূয়া এনজিওর নামে দেড় কোটি টাকা আত্মসাত করে উধাও

আছেফুল হুদা,রংপুর:রংপুরের মিঠাপুকুরে এমপি আশিকুর রহমানের পুত্র আশেক রহমানের নাম ভাঙ্গিয়ে হিউম্যান এন্ড নীডস নামের একটি ভূয়া এনজিও ফাঁদে পড়ে প্রায় ৭ হাজার ৮’শ ৭৪ নারী সদস্যের দেড় কোটি প্রতারনার শিকার হয়েছে। উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নে এ ঘটনায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরদের বিরুদ্ধে ওই টাকা উত্তোলনে ভূয়া এনজিওকে সহযোগিতার অভিযোগ উঠেছে। টাকা উদ্ধারে অনেক গ্রাহক ও ভূক্তভোগী উপজেলা চেয়ারম্যানকে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ওই টাকা উত্তেলনের পরে এনজিও মালিক গাঁ-ঢাকা দিয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে হিউম্যান এন্ড নীডস নামের এই ভুয়া এনজিওটি এলাকার সহজ সরল মানুষজন কে ৫ বছর ধরে রেশন দেয়ার নামে প্রতি জনের কাছ থেকে ১৫শত থেকে ২ হাজার টাকা উত্তোলন করেন। মিঠাপুকুরের ১৭ টি ইউনিয়ন থেকে প্রায় ৭ হাজার ৮শত ৭৮ জন নারীর কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি হাতিয়ে নেয়।


হিউম্যান এন্ড নীডসের বিরুদ্ধে প্রতারনার অভিযোগ উঠায়, মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জাকির সাহেব নীডসের সভাপতি আয়শা সিদ্দিকা লাবনীকে তার সমিতির কাগজ পত্র নিয়ে উপজেলা পরিষদে তলব করেন। এ সময় হিউম্যান নীডসের সভাপতি লাবনী তার সমিতির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হয়। তখন মিঠাপুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির সাহেব এলাকায় মাইকিং করে সমস্ত লোকের টাকা ফেরত দেয়ার নির্দেশ দেন। হিউম্যান নীডসের সভাপতি লাবনী এ সময় তোপের মূখে পড়লে। তাঁকে সেফ করার জন্য ওই ভূক্তভোগীদের লিখিত আকারে অভিযোগ দেওয়ার জন্য বলা হয়।
সরেজমিনে ঘুরে ও ভুক্তভোগির কাছ থেকে জানাযায়, ২০১৩ সালে আয়শা সিদ্দিকা লাবনী সভাপতি ও তার বোন লায়লা আকতার সাধারন সম্পাদক হিসাবে হিউম্যান এন্ড নীডস নামের একটি এনজিও জেলা সমবায় অফিস থেকে পীরগঞ্জ, ও কর্মক্ষেত্র মিঠাপুকুর এলাকায় রেজিষ্ট্রশন নেয় (যার নং ২০১৫)। শুরতেই পীরগঞ্জ এর কার্যক্রম চালু করেন। পীরগঞ্জে এই এনজিওটির বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দূনীর্তির অভিযোগ উঠে। অভিযোগের পওে পীরগঞ্জ উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা এটির রেজিষ্ট্রিশন বাতিলের জন্য জেলা সমবায় কর্মকর্তাকে লেখিত আকারে অবহিত করেন।
এনজিওটির সভাপতি লাবনী ও তার আপন বোন লায়লা আক্তারসহ মিঠাপুকুর এলাকায় গা-ঢাকা দিয়ে থাকেন।
এর পর ৬ মাস পূর্বে কর্মক্ষেত পরিবর্তন করে মিঠাপুকুর উপজেলা থানা থেকে 1 শত গজ পূর্ব দিকে আয়শা সিদ্দিকা লাবনী হিউম্যান এন্ড নীডসের একটি শাখা অফিস খুলে বসেন।
জনগনের সহজেই কাছে পৌঁছতে উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নের সংক্ষরিত মহিলা কাউন্সিলর ও বেশ কিছু মহিলা নেতৃীদেরকে নিয়ে উপজেলা অডিটোরিয়াম হল রুমে একটি সেমিনার করেন। মহিলা কাউন্সিলর ও মহিলা নেতৃীদেরকে বলা হয়, একজন সদস্যের কাছ থেকে ১৫শত থেকে ২ হাজার টাকা উত্তোলন করবেন। এতে করে প্রত্যেক সদস্যেদেরকে বছরে ৩ বার ৫ বছরে মোট ১৫ বার চাল, ডাল, তেল, ও আটা রেশন দেয়া হবে। প্রত্যেক বার প্রায় ১৪শত টাকার রেশন পাবেন। আর যারা সদস্যে সংগ্রহ করে দেবেন তারা পাবেন তিন ভাগের এক ভাগ টাকা। বড় ধরনের অর্থের লোভে ১০/১২ জন মহিলাকে দিয়ে ৩-৪ মাসে উপজেলার ১৭ টি ইউনিয়নে প্রায় ৮ হাজার সদস্য বানানো হয়। অল্প সময়ের মধ্যে সদস্যেদের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এছাড়াও প্রত্যেক সদস্যেদের কাছ থেকে সপ্তাহে ৩০ টাকা করে সঞ্চয় সংগ্রহ করা হয়।
সদস্যেদের চাপের মূখে কিছু কিছু সদস্যদেরকে অল্প কিছু রেশন দেয়া হয়।
অভিযোগ উঠেছে, মিঠাপুকুরের এমপি আশিকুর রহমানের পুত্র রাশেক রহমান নাম ভাঙ্গিয়ে তার বিশ্বস্ত লোক মহিলা আওয়ামীলীগের ইউনিয়ন সাধারণ সম্পাদক সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর শাহাজাদী, বেগম এই এনজিওর সদস্যদের বিশ্বস্ততা তৈরী করতে বলেন, এই এনজিওর সভাপতি আশিকুর রহমানে স্ত্রী রেহানা আশিকুর রহমান, এই কথা জানার পরে অতি অল্প সময়ে এত বেশি সদস্য ও এত টাকা মাঠ থেকে উঠাতে সক্ষম হয়ছে বলে সাজু নামের এক ইউপি সদস্য জানান। ইউপি সদস্য সাজু মিয়া আরও বলেন, আমি নিজেও এই প্রতারণার স্বীকার।
সদস্যদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রকারী উপজেলার কাশিমপুর গ্রামের হাছিনা বেগম জানান, আমি হিউম্যান এন্ড নীডসের সভাপতি লাবনী আপাকে আমার এলাকার ৩’শ ৮০ জনের সদস্যেদের কাছ ১৫শত টাকা করে মোট ৫ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা উত্তোলন করে দিয়েছি। আমাকে রেশন দেয়ার কথা বলে কয়েক দিন ধরে ঘুরাচ্ছে। আমি রেশন না নিয়ে এলাকায় যেতে পারছিনা। কয়েকদিন ধরে বাড়ি ঘর ছেড়ে পালিয়ে আছি। আমার কাছ কোন প্রকার ডকুমেন্ট না দিয়েই টাকা নিয়েছে। আমি উপজেলা চেয়ারম্যান জাকির ভ্ইাকে বিচার দিলে লাবনী আপা আমার ডাইরীতে ৫ লক্ষ ৬২ হাজার টাকা বুঝিয়া পাওয়ার স্বাক্ষর করে দেয়।
চেংমারি ইউনিয়নের রফিকুলের স্ত্রী ফরিদা বেগম জানান, আমি ৪০ হাজার টাকা লাবনী আপাকে দিয়েছি। ৯ দিন গাড়ি নিয়ে এসে মাল না নিয়ে ফেরত গিয়েছি। এতে আমার ৯ দিন গাড়ি ভাড়া বাবদ ৯ হাজার টাকা ক্ষতি পূরণ দিতে হয়েছে।
১৪ নং ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের শীতলগাড়ি গ্রামের আব্দুর রশিদের স্ত্রী লিপি বেগম বলেন, ইাম ৭০৪ জন সদস্যেদের কাছ থেকে রেশনের জন্য ৬ লক্ষ ৯১ হাজার ও সঞ্চয়ের ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা লাবনী আপাকে দিয়েছি। আমাকে পিয়ারী, শাহনাজ, মর্জিনা লাভের উপর টাকা নিয়ে রেশনের জন্য দিয়েছে। ওই টাকা আমি
লাবনী আপাকে দিয়েছি।
সরেজমিনে ঘুরেদেখা গেছে, শাহাজাদী বেগম, লতা নামের এক মহিলাকে কাজে লাগিয়ে ধুরন্ধর লাবনী আকতার মাঠ থেকে দেড়কোটি টাকা হাতিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে। উপহার হিসাবে লাতাকে একটি বাড়ির করার জন্য জমি ক্রয় করে দেন।
এবিষয়ে হিউম্যান এন্ড নীডসের সভাপতি অভিযুক্ত আয়শা সিদ্দিকী লাবনী বলেন, আমারা মিঠাপুকুর ও পীরগঞ্জ উপজেলায় সমিতির কাজ করার জন্য সমবায় থেকে রেজিষ্ট্রশন নিয়েছি। তবে মিঠাপুকুরে সমবায় অফিসে আমরা কোন লিখিত কাগজপত্র জমা দিতে পারিনি। আর আমরা কোন সদস্যদের সাথেও প্রতারনা করা হয়নি। পীরগঞ্জ সমিতির নাবায়নের মেয়াদ পার হয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, জেলা অফিসের জাহাঙ্গীর সাহেব আমাকে আপাতত চালাতে বলেছেন পরে সময় সুযোগে তিনি নবায়ন করে দিবেন।
মানব অধিকার ইউনিটি ফর ইউনিভার্স হিউম্যান রাইর্টস অব বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন, মিঠাপুকুর উপজেলার সভাপতি আজাহারুল ইসলাম নওশাদ বলেন, আমরা এই হিউম্যান এন্ড নীডস এনজিও খোঁজ নিয়ে জেনেছি এদের কোন বৈধতা নেই। এটির উৎপত্তি পীরগঞ্জ থেকে। আমরা সেখানে খোজ নিয়ে জানতে পেরেছি সেখানে এর কাযক্রম শুরু করে নানা অনিয়ম করে মিঠাপুকুরে এসে সেই অনিয়মের বীজ বপনন করেছে। এই অপরাধের সাথে সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলরা জড়িত আছে। এদিকে মহিলা কাউন্সিলরা অভিযোগ তুলে বলেন, মানব অধিকারের আজাহার সাহেব হিউম্যানের লাবনীর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে চুপ চাপ বসে ্আছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার সমবায় কর্মকর্তা মাসুদ রানা জানান, , হিউম্যান এন্ড নীডসের কোন কাগজপত্র আমাদের উপজেলা সমবায় অফিসে জমা দেননি। সমবায়ের লিখিত পারমিশন ছাড়া মিঠাপুকর উপজেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করে তারা বড় অন্যায় ও আইন বিরোধী কাজ করেছে। তার উপর সমবায়ের নামে হাজার হাজার লোকের সাথে প্রতারণা করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমি উপরে জানাবো। কোন সমবায় সমিতি ৫ লক্ষ টাকার উপরে লেনদেন করলে কোপারেটিভের এর অনুমোদন লাগবে। এই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম সম্পূন্ন রুপে অবৈধ।
জেলা সমবায় কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এটি বাতিলের জন্য দুই উপজেলা থেকে প্রতিবেদন পেয়েছি, রবিবারের মধ্যে হিউম্যান এন্ড নীডসের রেজিষ্ট্রশন বাতিল করা হবে।
এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান, জাকির সাহেব বলেন, আমার কাছে অভিযোগ এসেছে হিউম্যান এন্ড নীডস নামের একটি এনজিও আমার এলাকার লোকজনের কাছ থেকে প্রতারনার মাধ্যমে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি হাতিয়ে নিয়েছে। আমি এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের নির্দেশ দেয়া হবে।
এনপিনিউজ/আশিক


© ২০২১ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | এনপিনিউজ৭১.কম
Developed BY Rafi It Solution