বুধবার, ১২ মে ২০২১, ০৫:১২ অপরাহ্ন

রংপুর বিভাগের আট জেলায় গত ২০দিনে ৩০ টির বেশি ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে

রংপুর বিভাগের আট জেলায় গত ২০দিনে ৩০ টির বেশি ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে

রংপুর বিভাগের আট জেলায় গত ২০দিনে ৩০ টি ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। এসময় ধর্ষণ ও যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে পাঁচ বছরের শিশু থেকে ২৩ বছরের তরুণী । আর এসব ঘটনায় মূল অভিযুক্তদের অধিকাংশই সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তি। ধর্ষণের অভিযোগে কুড়িগ্রামের থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিএসসি শিক্ষক জিয়াউর রহমান, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলাম ও সাহেবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলজিয়াম মিয়া এবং রংপুর মহানগরীর জলকর এলাকার উষা আইডিয়াল কিন্ডার গার্টেনের প্রধান শিক্ষক জহুরুল ইসলামসহ এ পর্যন্ত ৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই শিক্ষকদের মধ্যে ধর্ষণের প্রবণতা বাড়ছে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য মতে, এই বিভাগে সর্বশেষ ৫ বছরের শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে শনিবার দুপুরে রংপুরের কুতুবপুর ইউনিয়নের অরুন্নেসা এলাকায়। রবিবার বিকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৯ নংওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন থাকা ওই শিশুটির মা জানান, কুতুবপুর ইউনিয়নের অরুন্নেসা এলাকার মুছি রাজ মোহনের ছেলে রঘু লাল (২৩) প্রতিদিন বাড়িতে টেলিভিশন দেখতে আসে। সে প্রতিদিনের মতো শনিবার দুপুরে বাড়িতে আসে। এসময় আমরা কেউ বাড়িতে ছিলাম না। এ সময় আমার মেয়েকে একা পেয়ে রঘু লাল (২৪) ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দিয়ে অবস্থার অবনতি হওয়ায় মেয়েকে রংপুরে হাসপাতালে এনেছি।
মেয়েটির বাবা বলেন, আমার মেয়েটি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান দুলুর কাছে গিয়েছি। তিনি আমাকে আইনের আশ্রয় নিতে বলেছেন।

কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান দুলু জানান, স্থানীয়ভাবে ধর্ষণের বিচার করার অধিকার নেই। তাই থানায় অভিযোগ দিতে বলেছি।
এর আগে ৮ ফেব্রুয়ারি রাতে রংপুরের হারাগাছের সারাই ইউনিয়নের কাচু বকুলতলা এলাকার দশম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শোয়ার ঘরের সিধ কেটে অপহরণ করে পাশের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রাতভর ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠে। এ ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত ওই মেয়েটির সাবেক প্রেমিক বিপ্লবকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। মেয়েটির সাথে বিপ্লবের তিনবছর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বিভিন্ন কারণে ওই সম্পর্ক ধরে রাখতে না চাইলে ক্ষুব্ধ হয়ে অপহরণের পর বিপ্লব ও তার সহযোগিরা দলবেধে ধর্ষণ করে বলে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য উঠে এসেছে।
এছাড়াও একাধিক ছাত্রীকে যৌন হয়রানীর অভিযোগে এর আগের দিন ৭ ফেব্রুয়ারি রংপুর মহানগরীর জলকর এলাকার উষা আইডিয়াল কিন্ডার গার্টেনের প্রধান শিক্ষক জহুরুল ইসলামকে জুতাপেটা করে পুলিশে দেয় অভিভাবকরা। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের বিচার চেয়ে বিক্ষোভও করেন অভিভাবকরা। পুলিশের তদন্তে ওঠে এসেছে, ওই শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে স্কুলের শিশু শিক্ষার্থীদের যৌন হয়রানি করে আসছিল। এর আগেও এধরনের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে সমঝোতা করা হয়েছিল।

একইদিনে ছাত্রীকে যৌন হয়রানির অভিযোগে লালমনিরহাটের কালিগঞ্জের গোড়ল ইউনিয়নের চাকলারহাটের অরণ্য স্কুল অ্যান্ড কলেজ ডে-নাইট কেয়ারের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আঞ্জুনুল হক সরকার মিন্টুর বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়। ওইদিন তাকে গ্রেফতারের দাবিতে অভিভাবকরা বিক্ষোভ করেন।  মিন্টুর বিরুদ্ধে অভিযোগ, ওই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের আবাসিকের এক ছাত্রীকে ৫ ফেব্রুয়ারি নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে মিন্টু (৪৮) পরীক্ষায় ভাল নম্বর পাইয়ে দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে  যৌন হয়রানি করে।
অন্যদিকে, গত ১ ফেব্রুয়ারি সকালে কুড়িগ্রামের থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিএসসি শিক্ষক জিয়াউর রহমানকে ওই বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানীর অভিযোগে এলাকাবাসির সহযোগিতায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত মতে, ঘটনার দিন ওই ছাত্রীকে প্রাইভেট পড়া শেষে শ্লীললতাহানি করে শিক্ষক জিয়াউর। বিষয়টি পরিবারের পক্ষ থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করা হলে তদন্ত হয়। পরে এলাকাবাসির সহযোগিতায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই শিক্ষকের দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবিতে এলাকাবাসি বিক্ষোভ করে।
এদিকে, গত ২ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার তালতলা উচ্চ বিদ্যালয়ের এক ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগে ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামকে এলাকাবাসির সহযোগিতায় গ্রেফতার করে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত মতে,  সন্ধ্যার পর প্রাইভেট পড়ানোর কথা বলে ওই স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ করে আসছিল শিক্ষক শহিদুল। ঘটনার দিন এলাকাবাসি আটক করে ওই শিক্ষকে পুলিশে দেয়।  এ ঘটনায় এলাকাবাসি বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধ করে রাখে। এসময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক রাউন্ড টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পুলিশ।

একইদিনে গত ২ ফেব্রুয়ারি দুপুরে নীলফামারীর কিশোরীগঞ্জ উপজেলার বড়ভিটা ইউনিয়নের ঘনপাড়া গ্রামের কৃষি শ্রমিক আইয়ুব আলীর শিশু কন্যাকে ধর্ষণ করে একই গ্রামের নিজাম উদ্দিনের ছেলে কাল্টু মামুদ (৫০)। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে নীলফামারী সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। পুলিশের তদন্ত মতে, ঘটনায় সময় শিশুটির মা-বাবা জমিতে কাজ করছিলেন। ওই সুযোগে বাড়িতে ঢুকে ওই ব্যাক্তি শিশুটিকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। কাজ শেষে বাড়িতে এসে মেয়েটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়ে স্থানীয়দের সহযোগিতায় হাসপাতালে নিয়ে যায় তার পরিবার।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি দিনাজপুর শহরের রামনগর হিরাহার এলাকায় এক মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণ করে রামনগর ইন্দারমোড় এলাকার যুবক আকাশ। এ ঘটনায় দিনাজপুর কোতোয়ালি থানায় মামলা করা হয়। পুলিশের তদন্ত মতে, ওইদিন সন্ধ্যায় কাজের জন্য বাইরে ছিলেন রাজমিস্ত্রি বাবা ও দিনমজুর মা। এ সুযোগে বাড়িতে প্রবেশ করে হাত ও মুখ বেধে ওই ছাত্রীকে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায় আকাশ । গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এলাকাবাসি মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসাপাতালে ভর্তি করেন।

গত ৮ ফেব্রুয়ারি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বেলজিয়াম মিয়াকে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার করে পুলিশ। তিনি কামারপাড়ার শিয়ালগাড়া তরফকামাল এলাকার স্কয়ার প্রি-ক্যাডেট কোচিং সেন্টারেরও পরিচালক। এ ঘটনায় এলাকাবাসি সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করে। পুলিশের তদন্ত মতে ঘটনার দিন দুপুরে বেলজিয়াম মিয়া কোচিং সেন্টারে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেন। এরপর এক ছাত্রীকে অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে চাকু দিয়ে হত্যার ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের চেষ্টা করে। এ সময় তার চিৎকারে তাকে খুঁজতে আসা অভিভাবকরা বেলজিয়ামকে আটক করে পুলিশে দেয়।
গাইবান্ধা সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহযোগি অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান অমিত পার্থ দাসের বিরুদ্ধে ২৬ জানুয়ারি কলেজের ৫ ছাত্রী যৌন হয়রানির অভিযোগ এনে এ বিষয়ে লিখিতভাবে অধ্যক্ষকে অবহিত করে। এ ঘটনায় কলেজ কর্তৃপক্ষ গণিত বিভাগের প্রধান ও  সহযোগি অধ্যাপক আব্দুর রউফ খানের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত টিম  গঠন করেন। এ ঘটনায় ওই শিক্ষককে গ্রেফতার এবং অপসারণের দাবিতে লাগাতার ক্লাস বর্জন করে শিক্ষক ও ছাত্র-ছাত্রীরা কলেজ ক্যাম্পাসে আন্দোলন করে আসছে।

৩১ জানুয়ারি দিনাজপুর শহরের রামনগর এলাকায় দ্বিতীয় শ্রেণি পড়–য়া এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণ করে প্রাইভেট শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম (৪৮) । পরে পুলিশ তাকে আটক করে। পুলিশের তদন্ত মতে রামনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী বিকেলে প্রাইভেট পড়তে শিক্ষক তৌহিদুল ইসলামের বাড়িতে যায়। কৌশলে সবাইকে ছুটি দিয়ে তৌহিদুল শিশুটিকে ধর্ষণ করে। শিশুটিকে দিনাজপুর এম. আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
২০ জানুয়ারি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার কাটলা ইউনিয়নে স্বামী পরিত্যাক্তা এক তরুণী গণধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় ফিরোজ (২৪) নামের এক যুবককে আটক করে পুলিশ। পুলিশের তদন্ত মতে, ১৮ জানুয়ারি বিকেলে ওই  তরুণী নানির বাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে ফেরার পথে ৫ যুবক তাকে তুলে নিয়ে লিচু বাগানে ধর্ষণ করে পালিয়ে যায়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়।

এ বিষয়ে রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ  জানান, ৫ বছরের শিশু থেকে তরুণী কেউ বাদ যাচ্ছে না ধর্ষণ ও যৌন হয়রানি থেকে। বিশেষ করে ধর্ষকদের তালিকায় সরকারি-বেসরকারি কলেজ ও স্কুলের শিক্ষক এবং কোচিং সেন্টার ও কিন্ডার গার্টেনের মালিক-শিক্ষকের আধিক্য প্রমাণ করে আমাদের নৈতিক অবস্থা কতটা শোচনীয়। এছাড়াও বৃদ্ধদের লালসার শিকার হচ্ছেন শিশুরা। তিনি বলেন, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে নীতি নৈতিকতার চর্চা না থাকার কারণে এবং শিক্ষার প্রকৃত আলো নিজেদের ভেতরে না থাকায় কিছু মানুষ এখনও সার্টিফিকেট নির্ভর শিক্ষিত হয়ে আছে। এদের মধ্যে এখনও মানবিকতা ও মানবতা জেগে ওঠেনি।

পৈশাচিকতাই তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক আরও বলেন, স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া না হলে ভয়াবহ এই পরিস্থিতি উত্তরণের কোনো উপায় থাকবে না।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published.

© All rights reserved © 2020-21 npnews71.com
Developed BY Akm Sumon Miah