শনিবার, ০৮ মে ২০২১, ০৬:৩৯ পূর্বাহ্ন

সৈয়দপুরে ভাইরাল হওয়া ত্রাণের স্লিপ বিক্রির ঘটনা ধামাচাপা দিতে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন

সৈয়দপুরে ভাইরাল হওয়া ত্রাণের স্লিপ বিক্রির ঘটনা ধামাচাপা দিতে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন

এনপিনিউজ৭১/শাহজাহান আলী মনন/ ২১ এপ্রিল রংপুর

নীলফামারীর সৈয়দপুরে উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি কর্তৃক করোনায় বিপর্যস্ত কর্মহীন ক্ষুধার্ত মানুষের মাঝে সরকারী ত্রাণের স্লিপ বিক্রির সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ এবং তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার প্রেক্ষিতে ঘটনাটিকে ধামাচাপা দিতে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করা হচ্ছে। সে সাথে ব্যক্তিগত দোষ ঢাকতে সংগঠনকে ব্যবহার করে স্থানীয় নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনসহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দকে প্রভাবিত করার লবিং চলছে। পাশাপাশি বিষয়টিকে দলের প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও দলীয় ভিন্ন গ্রুপের চক্রান্ত বলে অপপ্রচার চালানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। একইসাথে সংবাদটি প্রকাশকৃত সংবাদকর্মীদের মিথ্যেচার দিয়ে হেয় করাসহ দেখে নেয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। যা দলের একনিষ্ঠ ত্যাগী নেতা-কর্মী ও সাধারণ সচেতন মহলের মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। চরম সমানালোচনার ঝড় বয়ে যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ অফিস, বাজার, পাড়া-মহল্লায় এবং ব্যক্তিগত পারস্পারিক মুঠোফোন আলাপচারিতায়।
গত ১৭ এপ্রিল কয়েকটি দৈনিক পত্রিকাসহ অসংখ্য অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত হয় সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি ও হাজারীহাট মোহাম্মদীয়া দাখিল মাদরাসার জীব বিজ্ঞানের সহকারী শিক্ষক এবং খাতামধুপুর ইউনিয়নের সাবেক মহিলা মেম্বার হাসিনা বেগমের স্বামী মোঃ আজম আলী সরকার কর্তৃক ত্রাণের স্লিপ ১শ’ টাকা করে বিক্রির সংবাদ। এতে বলা হয় উপজেলার খাতামধুুপুর ইউনিয়নের ১ নং ওয়ার্ড খালিশা গ্রামের মিলের পাড় এলাকার হতদরিদ্র মানুষের মাঝে গত ১৪ এপ্রিল ত্রাণের স্লিপ বিক্রি করেন আজম আলী সরকার। ওই এলাকার প্রায় ২৭ জনের কাছে ১শ’ টাকা করে নেয় স্লিপ দিয়ে। এর মধ্যে ২৫ জনকে স্লিপ দেওয়া হয়, যারা পরের দিন ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চাল উত্তোলন করেন। এতে ১০ কেজির জায়গায় ৮/৯ কেজি করে চাল পেয়েছেন বলেও অভিযোগ তোলেন স্লিপক্রয়কারী বেশ কয়েকজন। এরা হলেন জিকরুলের ছেলে জিল্লুর, রশিদুলের স্ত্রী সাইতি, আমিনুলের স্ত্রী শাহানা, কাল্টিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা, বাচ্চুর স্ত্রী মিনুসহ আরও অনেকে। এদের মধ্যে ২ জন টাকা দিয়েও স্লিপ পাননি এবং টাকাও ফেরত দেয়নি আজম। এরা হলো আতিউরের স্ত্রী মমতা ও আশরাফের স্ত্রী। এমনকি টাকা না দেয়ায় স্লিপ দেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন আলমের স্ত্রী শিল্পী ও আতিকুলের স্ত্রী মমতা।
সংবাদটি প্রকাশ হওয়া মাত্রই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহুর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় খবরটি। চলতে থাকে কমেন্ট বক্সে সমালোনচনার ঝড়। এতে দেখা যায় সিংহভাগ মানুষই ঘটনাটির নিন্দা জানিয়ে এর বিচার দাবি করেন। বিশেষ করে সৈয়দপুরের আওয়ামীলীগ সংশ্লিষ্ট ফেসবুকাররা তুমুল স্ট্যাটাস ও কমেন্ট বর্ষণ করতে থাকেন। এরই মাঝে দলের কেন্দ্রীয় নেত্রী আমেনা কোহিনুর আজমের পক্ষ অবলম্বন করে স্ট্যাটাস দেন। যাতে তিনি এ ঘটনাকে আজমের বিরুদ্ধবাদীদের ষড়যন্ত্র বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটা জামায়াত বিএনপি ঘরানার আওয়ামী বিরোধী শক্তির অপপ্রচারনা। যা হলুদ সাংবাদিকতার মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি এজন্য সংশ্লিষ্ট সংবাদকর্মীদের কঠোর হাতে দমনের জন্য দলের নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তাদের সোচ্চার হওয়ার কথা বলেন। এর ফলে শুরু হয় আজমের সাথে সাথে আমেনা কোহিনুরের বিরুদ্ধেও কমেন্ট বর্ষন। এরই এক ফাঁকে কমেন্ট করেন সৈয়দপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক মহসিনুল হক মহসিন। তিনি লিখেছেন নিজ উদ্যোগে তদন্ত করে দেখেছেন ঘটনাটি সাজানো এবং একজন বিএনপিপন্থী সাংবাদিকের কাজ। এই কমেন্টের পর আরও সরগরম হয়ে উঠে ফেসবুক পেজের স্ট্যাটাসগুলোর বহর। প্রশ্ন উঠে দলীয় বা প্রশাসনিকভাবে তদন্ত করে বিষয়টি যাচাই সাপেক্ষে কোন রিপোর্ট বা মন্তব্য না করতেই কেন কতিপয় নেতা-কর্মী আজমের পক্ষাবলম্বন করে তাকে ধোয়া তুলশিপাতা ভাবছেন। কারণ তার অতীত অনেক কেলেঙ্কারী রয়েছে। যা সৈয়দপুরবাসী সকলেরই জানা। তাছাড়া ঘটনাটি সত্য হলে সে যে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার মত অপরাধ করেছে তা এড়িয়ে যাওয়া কতটুকু সমীচিন হয়েছে? সবকিছুকে জামাত-বিএপি’র ষড়যন্ত্র তকমা দিয়ে ব্যক্তিগত এহেন অপকর্মকে ঢাকার সুযোগ করে দেয়া হলে আজ ১ টাকার লোভ যে সামলাতে পারেনি তার দ্বারা আরও বড় ধরণের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার মধ্য দিয়ে দলের ও সরকারের চরম ক্ষতি হতে পারে। এতে একের পর এক দলীয় সমর্থকরাই বিভিন্ন অতীত কর্মকান্ড তুলে ধরতে থাকে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তড়িঘড়ি করে রাতেই ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের মাধ্যমে অভিযোগকারীদের দু’একজনকে ধরে এনে থানায় জবানবন্দি নেওয়া হয় যে স্লিপ বিক্রির কোন ঘটনা ঘটেনি। এমতাবস্থায় ওই অভিযোগকারীদের স্লিপ ক্রয়ের স্বীকারোক্তিমুলক ভিডিও চিত্র প্রকাশ করে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার সৈয়দপুর প্রতিনিধি মোঃ জাকির হোসেন। এরপর থেকে যেন লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের বিশ্বকাপ লড়াই শুরু হয়ে যায় নীল-সাদা ফেসবুক জগতে।
এতে চরম বেকায়দায় পড়ে যায় আজম ও তার পক্ষাবলম্বনকারীরা। চলতে থাকে সংবাদ প্রকাশকারী সংবাদকর্মীদের ম্যানেজ করার তৎপরতা। কিন্তু তাতে সফল না হওয়ায় বাধ্য হয়ে পরের দিন সকালে আজম আলীর গ্রামের বাড়ি খাতামধুপুর ইউনিয়নের হাজিপাড়ায় স্বেচ্ছাসেবকলীগ পৌর কমিটির সহ-সেক্রেটারী রতনকে দিয়ে গুটি কয়েক সংবাদকর্মীকে নিয়ে করা হয় সংবাদ সম্মেলন। যা মাত্র দুটি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশ করা হয় কোন প্রকার ছবি ছাড়াই। এতে আবারও প্রশ্নের বাণ ছুড়তে থাকে ভার্চুয়াল ডিভাইস ইউজাররা। এবার আরও বেশি কোনঠাসা হয়ে পড়ে আজমের সহকর্মীবৃন্দ। তাই আজমকে বেকসুর দাবি জোড়ালো করতে চিন্তাভাবনার আপডেট করে ২০ এপ্রিল আবারও করা হয় সংবাদ সম্মেলন। উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ’র ব্যানারে করা এই সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না খোদ সংগঠনেরই (উপজেলা স্বেচ্ছাসেবকলীগ) সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম রয়েলসহ অধিকাংশ নেতৃবৃন্দ। এতে লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন আজম আলী সরকার। যাতে এ ঘটনাকে একই দলের প্রতিপক্ষ গ্রুপকে দোষারোপ করে সংবাদ প্রকাশকারী সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধ রাজনীতির সমর্থক আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেন। যদিও ওই সাংবাদিকদের তার সংবাদ সম্মেলনে ডাকা হয়নি। যাতে প্রকৃত সত্যের মুখোমুখি হয়ে আবারও বেকায়দায় পড়তে না হয়ে। ফলে একই বিষয় নিয়ে বার বার সংবাদ সম্মেলন করাসহ সত্যকে উপেক্ষা করে মিথ্যে দিয়ে ব্যক্তিগত অপরাধ ঢাকতে সংগঠনকে ব্যবহার করার অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী সমর্থক মহল থেকেই।
বিগত কয়েকদিন থেকে এ ঘটনাগুলো নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার টক অব দ্যা পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যা আগামীতে আরও কোন পর্যায়ে পৌছায় তা নিয়ে জনমনে ব্যাপক কৌতুহল ও উৎসাহ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এ ব্যাপারে দৈনিক নয়া দিগন্ত সৈয়দপুর প্রতিনিধি মোঃ জাকির হোসেন বলেন, আমরা ব্যক্তি আজমের বা তার দলের প্রতিপক্ষ নই। বরং আমরা সত্য, ন্যায় আর আদর্শের পক্ষে। আজমের সাথে আমাদের ব্যক্তিগত কোন প্রতিহিংসা বা বিরোধ নেই। তার অপকর্ম পেয়েছি তা তুলে ধরেছি। কারণ সরকার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে করোনার মত দূর্যোগে দেশের মানুষে পাশে থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করতে। এজন্য চলছে আপদকালীন খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম। এ কার্যক্রমকে সাধুবাদ জানাই এবং এতে যেন কোন প্রকার অনিয়ম বা দূর্নীতি না হয় সে লক্ষ্যেই আমরা মাঠে ময়দানে অবস্থান করে চলেছি। এমতাবস্থায় টাকার বিনিময়ে ত্রাণের স্লিপ বিক্রির মত ঘটনা জানতে পেরে এবং এ সংক্রান্ত যথেষ্ট তথ্য তথা অভিযোগকারীদের বক্তব্য পাওয়ার পরই তা প্রকাশ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব থেকেই আমরা কাজ করেছি। এখানে প্রতিপক্ষ শক্তি বা কোন গোষ্ঠির পক্ষাবলম্বন করার আজগুবি প্রচারণা শুধু মিথ্যেচারই নয় সত্যকে ধামাচাপা দিয়ে অপরাধকে জিইয়ে রাখার অমানবিক ও আইনবিরুদ্ধ অন্যায় বলেই আমি মনে করি।

এনপি৭১/মেহি/নীলফামারী

Please Share This Post in Your Social Media

Comments are closed.

© All rights reserved © 2020-21 npnews71.com
Developed BY Akm Sumon Miah