মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০৭:০৯ পূর্বাহ্ন

স্বর্ণ জয়ন্তীক্ষণে দাবানল এবং একজন অদম্য বাটুল

স্বর্ণ জয়ন্তীক্ষণে দাবানল এবং একজন অদম্য বাটুল

এনপিনিউজ৭১/ নিজেস্ব প্রতিবেদক/ ২৭ মে

আজ ২৭ মে। রংপুরের সংবাদপত্র জগতে একটি ঐতিহাসিক দিন। এই দিনে অদম্য এক যোদ্ধার হাতে জন্মেছিল একটি পত্রিকা। যার নাম দাবানল। হ্যা, দৈনিক দাবানল এর কথা বলছি। রংপুরের প্রাচীনতম এই সংবাদ মাধ্যমটি প্রকাশনায় নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে আজ পঞ্চাশে পা রাখলো। পঁচিশ বছর আগে ১৯৯৫ সালে রজত জয়ন্তী উদযাপন হয়েছিল। সেই দাবানল আজ স্বপ্ন বুনন ও গৌরবোজ্জ্বল পথচলার ৪৯ বছর পেরিয়ে পঞ্চাশে।
 সুবর্ণ জয়ন্তী বা স্বর্ণ জয়ন্তীক্ষণে পদার্পণ স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো একটি দিন। এই দিনটি সত্যি বিস্ময়ের। কত রঙ চটা আয়োজন আর উৎসব দেখার সাথে বহু মুখের স্মৃতিবিজড়িত উচ্চারণ শোনা যেত আজ। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীতে হামাগুড়ি দেওয়া দাবানল আজ বিংশ শতাব্দীতে কোভিড-১৯ (করোনাভাইরাস) মহামারির কাছে ধরাশায়ী। ইচ্ছে থাকলেও আজ আর কোনো উৎসব আয়োজনের সুযোগ নেই। করোনার কারণে থমকে গেল স্বর্ণ জয়ন্তীতে পদার্পণ আয়োজন। বৈশ্বিক এই মহামারি শেষে দাবানল ঠিকই উৎসবে মাতবে।
পঞ্চাশে পা রাখা উদ্দীপ্ত আজকের দাবানল এর সূচনা হয়েছিল ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গন’ নামে। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উজ্জীবিত ‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গন’। বাংলাদেশের মুক্তাঞ্চল লালমনিরহাটের পাটগ্রাম থেকে প্রকাশ হয়েছিল এই পত্রিকাটি। মুস্তফা করিম ছদ্মনামে পত্রিকাটির প্রকাশক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল।
‘সাপ্তাহিক রণাঙ্গন’ দেশ মাতৃকার সেবায় ও স্বাধীনতাকামী মানুষের সাহস জোগানোর যে অনুপ্রেরণা ও দুঃসাহস দেখিয়েছে, তা স্বাধীনতার ইতিহাস ও সেই সময়ের মুক্তিকামী জনতার হৃদয়ে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। একাত্তর-পরবর্তী দেশ স্বাধীন হওয়ার পর রণাঙ্গন বন্ধ করে দেওয়া হলে ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ নামধারণ করে নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে।
পরবর্তী সময়ে পাঠকের চাহিদা ও দৈনিক সংবাদপত্র প্রকাশের জন্য দায়বদ্ধতা থেকে ১৯৮১ সালের ২৭ মে থেকে ‘দৈনিক দাবানল’ নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিয়মিত প্রকাশ হয়ে আসছে। অনেক চড়াই-উতড়াই পেরিয়ে বুট, বুলেটের কষাঘাতে ঝাঁজড়ে পড়া একাত্তরের রক্ত ললাট প্রান্তর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক রণাঙ্গনই আজকের দৈনিক দাবানল। আর এ অগ্রযাত্রার নায়ক বীরোচিত এক অদম্য যোদ্ধা খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। তার জীবন, যৌবন আর সব আয়োজন সংবাদপত্র ঘিরেই।
খবরের কাগজে যেন তিনি রচনা করেছেন জীবনের রেখা চিত্র। যাত্রা সহজ নয়, বিঘ্নের কাঁটায় ভরা সেই পথ, তবুও দৃঢ় মনোবল আর প্রত্যয়ের নিষ্ঠ সাধনায় পাঁচ দশক ধরে আলো ছড়াচ্ছেন তিনি। রংপুরের সংবাদপত্র, সাংবাদিকতার প্রসঙ্গ এলেই তার নামটি উচ্চারিত হয়। তিনি সাংবাদিক, সংবাদপত্রের প্রতিষ্ঠাতা। বলতে হয় সফল প্রতিষ্ঠাতা। দেশের ইতিহাসে তিনি একমাত্র সফল প্রকাশক ও সম্পাদক। যার নামের সাথে রয়েছে একটানা পঞ্চাশ বছরের সাফল্য।
মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল, তাঁর নিরলস মেধা, পরিশ্রম ও সাহসিকতায় নিজেকে আবিষ্কার করেছেন অদ্বিতীয় হিসেবে। তার হাত ধরে দাবানল থেকে উত্তর জনপদে সৃষ্টি হয়েছেন অনেক সাংবাদিক, কবি, লেখক, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তারকা। যাদের বিচরণের নেপথ্যে দাবানল।
দেশ স্বাধীনের পর শুরু হয় রণাঙ্গনের সাহসী পথচলা। কিন্তু সেই সময়কার শাসকগোষ্ঠীর তোপের মুখে পড়ে রণাঙ্গন। সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা অফিসে হামলা চালিয়ে সব তছনছ করে দেয়। রণাঙ্গণ বাজেয়াপ্ত করে সরকার। পরবর্তী সময়ে বিভাগীয় কমিশনার অফিসে আপিল করে ছাপাখানাটি ফেরত পেলেও বাতিল হয় রণাঙ্গণের ডিক্লারেশন । এরপর প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত প্রকাশনা অব্যাহত থাকে ‘সাপ্তাহিক মহাকাল’ এর। পাঠকের চাহিদা থেকে ১৯৮১ সালের ২৭ মে খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল প্রতিষ্ঠা করেন ‘দৈনিক দাবানল’।
বাটুল প্রতিষ্ঠিত এ তিনটি পত্রিকায় কাজ করেছেন দেশ-বিদেশের প্রথিতযশা অনেক সাংবাদিক। চারণ সাংবাদিক মোনাজাত উদ্দিন, আমেরিকা থেকে প্রকাশিত ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র সাংবাদিক আব্দুল মালেক, রংপুর থেকে প্রকাশিত দৈনিক বায়ান্নর আলোর নির্বাহী সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) মোনাব্বর হোসেন মনা, দৈনিক যুগের আলোর বার্তা সম্পাদক আবু তালেব, বিটিভির সাবেক রংপুর প্রতিনিধি আলী আশরাফ, এটিএন বাংলার মাহবুবুল ইসলাম ও কেরামত উল্লাহ বিপ্লব, বার্তা২৪.কমের সিনিয়র রিপোর্টার সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, জাগোনিউজের বার্তা সম্পাদক মাহাবুর আলম সোহাগ। নব্বইয়ের দশকে কাজ শুরু করেন বর্তমানের অসংখ্য গুণী সাংবাদিক। যারা দৈনিক দাবানলের অমর সৃষ্টি। এ ছাড়াও রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের বিদম্যান অধিকাংশ পত্রিকাও তারই হাতে গড়া সাংবাদিকদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হয়ে আসছে।
একজন অদম্য বাটুল
বর্ষীয়ান এই সাংবাদিক ১৯৪৩ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার বালারহাট ইউনিয়নের বুজরুক ঝালাই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। বাবা এলএমএফ (চিকিৎসক) ডা. মোজাম্মেল হক খন্দকার। বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী তিনি। অসংখ্য ঐতিহাসিক ও স্মৃতিবিজড়িত ঘটনার স্বাক্ষীও ।
খন্দকার বাটুল বাড়ির পাশের কোনাপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে মা-বাবার সঙ্গে রংপুরে বসবাস শুরু করেন। ভর্তি হন পার্শ্ববর্তী ঐতিহ্যবাহী কৈলাশরঞ্জন হাইস্কুলে। ১৯৬০ সালে কৈলাশরঞ্জন স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হন কারমাইকেল কলেজে।
তখন তার বাড়ন্ত যৌবন। যৌবনের শুরুতেই জড়িয়ে পড়েন নেতৃৃত্বে। জড়িয়ে পড়েন পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনে। আর ক্যাম্পাসের বাইরে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুরের সেনপাড়ায় (বর্তমান সেনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) খেলাঘর আসর। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনসহ নানা কারণে পালিয়ে থাকতে হয়েছে তাকে। ফলে উচ্চমাধ্যমিক পাস করতে তার সময় লাগে ৪ বছর।
১৯৬৪ সালে তখনকার দিনের ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩ জন কেন্দ্রীয় নেতা আসেন রংপুরে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে অংশ নিতে। তখন তাদের আটক করে জেলে পাঠানো হয়। সেই সময় রংপুর জেলা ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক তিনি। এ আটকের প্রতিবাদে পুরো জেলায় হরতাল ডাক দেন বাটুল। এ কারণে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি জেলবন্দি থাকেন ৬ মাস। পরে মুক্ত হন।
ওই বছরেই কারমাইকেল কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। কিন্তু কারমাইকেল কলেজ সরকারি হওয়ার পর আইয়ুব খানবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাকে কারমাইকেল কলেজ দ্বাদশ শ্রেণিতে ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায়। পরে তিনি ভর্তি হন রংপুর সরকারি কলেজে। ১৯৬৫ থেকে ৬৬ সালে রংপুর কলেজের জিএস নির্বাচিত হন তিনি। ছাত্র অবস্থাতেই জড়িয়ে পড়েন শ্রমিক আন্দোলনে। তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন রংপুর-দিনাজপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন। স্নাতক পাসের পর উচ্চশিক্ষায় ব্রতী না হয়ে তিনি যোগ দেন শ্রমিক সংগঠন সম্প্রসারণে। যুগপদ শ্রমিক আন্দোলনের কারণে ১৯৭০ সালে মার্শাল ল’র সময় তার ৬ মাসের জেল হয়।
এরই মাঝে ঘনিয়ে আসে ১৯৭১ সাল। ওই বছরের ১২ মার্চ মজদুর ফেডারেশনের ব্যানারে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি মাঠে শ্রমিক জনসভায় আনুষ্ঠনিকভাবে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে সেখানে মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু করার দীপ্ত শপথ গ্রহণ করেন বাটুল। সারা দেশে স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনে মুখর হয়ে উঠে মানুষ।
পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী অবস্থা বেগতিক দেখে ঢাকায় খাদ্যশস্য মজুতের পরিকল্পনা নিয়ে উত্তরাঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে ঢাকায় মজুত করতে থাকে। এ অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিহত করার ডাক দেন তৎকালীন রংপুর-দিনজাপুর মোটর শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল। ২৩ মার্চ স্থানীয় তেঁতুলতলায় (বর্তমানে শাপলা চত্বর) এক শ্রমিক সভায় শ্রমিকদের খাদ্যশস্য পরিবহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন বাটুল। ফলে পরদিন থেকে খাদ্যশস্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। এতে শাসকগোষ্ঠী বাটুলের ওপর প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। এ অবস্থায় নিরাপত্তাহীনতার কথা চিন্তা করে ২৬ মার্চ রাতে গঙ্গাচড়ার মহিপুর হয়ে তিস্তা পাড়ি দিয়ে লালমনিরহাটের কালীগঞ্জে যান বাটুল।
পরে সেখান থেকে ২৭ মার্চ ভারতের কুচবিহারের দিনহাটার সিতাই বন্দরে চলে যান তিনি। সেখানে গিয়ে ‘ফরওয়ার্ড ব্লক’ নামের একটি রাজনীতিক দলের শরণাপন্ন হয়ে তাদের আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওই এলাকার ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা কমল গুহ বাংলাদেশের অন্যতম রাজনৈতিক নেতা অলি আহাদের সহপাঠী ছিলেন। কমল গুহের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাটুল সহযোগিতা কামনা করেন। ভারতে থেকেই শুরু করেন সাপ্তাহিক রনাঙ্গণ প্রকাশনা। মুক্তিকামী মানুষের কাছে খবর পৌঁছে দিতে এই পত্রিকার ক’জন যোদ্ধা জীবন উৎসর্গ করে গেছেন।
মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সংবাদপত্র প্রকাশনার পাশাপাশি খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল  সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৭৯ সালে মিঠাপুকুর থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। শুধু সাংবাদিকতা, সম্পাদনা আর রাজনীতির মধ্যেই থেমে ছিলেন না বাটুল। মিঠাপুকুর পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির অন্যতম উদ্যোক্তা হিসেবে সেটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার হাতে গড়া সংগঠন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন এখন উত্তরাঞ্চলে সব থেকে প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী সংগঠন। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ঐতিহ্যবাহী সংগঠন রংপুর খেলাঘর, শিখা সংসদসহ অসংখ্য সংগঠন।
সাংবাদিকতায় অনবদ্য অবদান রাখার জন্য রংপুর পৌরসভার সিটিজেন অ্যাওয়ার্ড, রংপুর রিপোর্টার্স ক্লাবের মোনাজাত উদ্দিন সাংবাদিকতা স্মৃতিপদক, আজীবন সম্মাননা পদকসহ অসংখ্য পদক পেয়েছেন তিনি। সাতাত্তর বছর বয়সী অদম্য এই গুণী সাংবাদিক  এখন বয়সের ভারে ন্যুয়ে পড়েছেন। তবুও থামেনি তার যুদ্ধ। জীবন সায়াহ্নে এসে আর চাওয়া-পাওয়ার কিছুই নেই তার। তবে আক্ষেপ রয়েছে হৃদয়জুড়ে।
করোনাকালে দৈনিক দাবানল এর সুবর্ণ জয়ন্তীক্ষণে অজস্র সালাম সাংবাদিক, সাংবাদিকতা, সংবাদপত্রের নির্ভীক কারিগর মুক্তিযোদ্ধা খন্দকার গোলাম মোস্তফা বাটুল এর প্রতি। বেঁচে থাকুক দাবানল।
এনপি৭১


© All rights reserved © 2020-21 npnews71.com
Developed BY Akm Sumon Miah